শ্রীমৎ ক্ষেপা স্বামী জীবানন্দ জীবনী

ওঁ তৎ সৎ

১৩৩৪ সন হইতে মহাযোগী শ্রীশ্রীমৎ স্বামী ক্ষেপা জীবানন্দ পরমহংস জীবানন্দ মহারাজের দেহ ত্যাগ করিবার সময় পর্যন্ত আমার(শ্রীমৎ নিখিল গোবিন্দ দত্ত ওরফে শ্রীমৎ স্বামী নিখিলানন্দ মহারাজ)সাক্ষাৎ কালীন মহারাজ,প্রথম পরিচালক মানব ধর্ম্ম প্রচারক সংঘ)সাক্ষাৎ কালীন ঘটনাবলীর পান্ডুলিপিঃ-

প্রাণাচার্য্য মহাযোগী শ্রীশ্রীমৎ স্বামী ক্ষেপা জীবানন্দ পরমহংস জীবানন্দ মহারাজের ঠিকানা(তাঁহার পান্ডুলিপি হইতে উদ্ধৃত) পরমহংস প্রাণাচার্য্য শ্রীশ্রী মৎ স্বামী জীবানন্দ মহারাজ(অঘোরপন্থী)ওরফে শ্যাম ক্ষেপা,ওরফে নারা-সন্যাসী,চুঙ্গাধারী বাবাজী, সাকিনঃ-নিত্যানন্দ পুর,ডাকঘরঃ-বিষ্ণুপুর,জেলাঃ-সমাধী। উনি ঠিকানা বলতেন নাম জীবানন্দ,জন্মভূমি বীরভূম,কালিকাপুর গ্রামে।

নিবেদকঃ-শ্রীমৎ নিখিল গোবিন্দ দত্ত ওরফে শ্রীমৎ স্বামী নিখিলানন্দ মহারাজ,

প্রথম পরিচালক  মানব ধর্ম্ম প্রচারক সংঘ।

সংক্ষিপ্ত ঘটনাবলীঃ-

ব্রীং ধাতু উৎপত্তিগত তত্ত্ব অধিকারী প্রাণাচার্য্য পরমহংস শ্রীশ্রী মৎ স্বামী জীবানন্দ মহারাজ জীর সংগে(প্রকট ৯৯৮৭সাল ১৩ই ফাল্গুন বিষ্ণু সংক্রান্তি যোগে রাত্রী-১২টা ২৮মিনিট ৭ সেকেন্ড আর্বিভূত হন। শংঙ্খ,চক্র,গদা,পদ্ম ধারী প্রতীক স্বরূপ চিহ্ন তাঁর দক্ষিন হস্তে ছিল এবং তিনির আজানুলম্বিত বাহু ছিল) প্রথম বার দেখা হয় ১৩৩৪ সনের জৈষ্ঠ্যে মাসে পাবনা জেলার রায়গঞ্জ থানার অধীন আমার বাস্থ ভিটা ঝাপড়া গ্রামে মতিলাল পাল মহাশয়ের বাসভবনে। ঐ তারিখে ঊনি ৮ দফা বিষয় লিখিয়া দেন। কাগজ খানায় লেখা ছিল(১)লেখাপড়া আর হবে না।(২) পৈত্রিক সম্পত্তি হইতে বঞ্চিত (৩)বিদেশে বাস (৪)ধর্ম ক্ষেত্রে অগাধ জ্ঞান সম্পূর্ন হইবে (৫) বিবাহ দ্বারা সম্পত্তি লাভ ও ক্ষনস্থায়ী (৬) তোমা দ্বারা মঠ,মন্দির সৃষ্ঠি হইবে (৭) ধর্ম যাজক (৮)পরিব্রাজক । কাগজে আমার কোন নাম লেখা ছিল না । কাগজটি উনি আমাকে দিয়া বলেন তোর নিকট রেখে দিও। কাগজ খানা আমি আমার বই রাখা সুটকেসে মধ্যে রেখে দিয়াছিলাম তারপর বাবা আমার পড়ার খরচ-পত্র বন্দ করে দিলেন। মা মারা যান আমার যখন ৮বছর বয়স। তারপর বাবা ধুনট হাই স্কুলে ভর্তি করে দেন। টাকার অভাবে পড়া আর হল না। তারপর আমার খুরিমার ভাই ডেমাজানী নিবাসী  (বগুড়া) শ্রী নরেন্দ নাথ পাল (আমার মামা) সাহায্যে বগুড়া,শেরপুর,শ্রী যুক্ত মনীন্দ্র নাথ চক্রবতী কবিরাজ মহাশয়ের নিকট আয়ুর্ব্বেদ শিক্ষা আরম্ভ করিলাম। ৪ বৎসর যাবৎ আয়ুর্ব্বেদ শিক্ষা করিবার পর বগুড়া সদরে নব আয়ুর্ব্বেদ ভান্ডারে ব্রাঞ্চ ডিস্পেনচারির কবিরাজ নির্বাচিত হই ১৭.০০ টাকা বেতনে। ১৩৪০সনে পৌষ মাসে ধুনটে আমার লজিং মাষ্টার মারা গেলেন। তিনি অপুত্রক ছিলেন। আমার বন্ধু বান্ধব ও ধুনটের প্রধান মাতব্বর সকলের অনুরোধে যোঁগেশ চন্দ্র মহাশয়ের বড় মেয়েকে বিবাহ করিলাম,১৩৪৩ সনের জৈষ্ঠ্য মাসে ৮তারিখ শুক্রবার। বিবাহের পর ধুনটে বসবাস আরম্ভ করিলাম। ১৩৪৪ সনে জৈষ্ঠ্য মাসে শেষে একদিন ধুনটে পার্শ্ববতী গ্রাম গুর্জ্জিয়া নিবাসী এক আমার পরিচিত তরনী কান্ত সরকার নামে এক ব্যাক্তি আমাকে এসে বলেন “আমাদের বুড়া গোসাই এসেছেন” তিনির বয়স ৪৫০বৎসর,নাম জীবানন্দ আমি বলিলাম কোন জীবানন্দ? তরনী দা বলিলেন তাহা তো আমি জানি না। যাইহোক নদীতে তখন নতুন বর্ষার জল আসিয়াছে। কস্তূরী পানা নদী ভর্ত্তি দক্ষিনে প্রবাহিত হইতেছে। আমি আর আমার বাল্য বন্ধু চরকাদহ নিবাসী অনাথ বন্ধু সরকার গামছা পরে,মাথায় কাপড় জড়াইয়া রাত্রি ১১টা নদী সাতার দিয়ে পরপারে গুর্জ্জিয়া তরনী সরকারের বাড়ী পৌঁছিলাম।সেটি একটি নম:শুদ্র পল্লী। বাড়ীর ভিতরে গিয়ে দেখি বাড়ীর উঠানে সামিয়ানা টাঙ্গানো, ৫০/৫৫ জন লোক আসনে  বসে যোগ কর্ম্মে রত। দক্ষিন দুয়ারী ঘরের বারান্দায় ৭/৮ জন সাধু লম্বা চুল দাড়িওয়ালা বিশিষ্ট যোগ কর্মে রত। ঐ রূপ কর্ম ইতি পূর্বে আমি দেখি নাই। লক্ষ্য করিলাম বারান্দায় সবার পূর্ব্ব পার্শ্বে বসে কর্ম্মে রত এক বুড়া সাধু সবার চেয়ে উচু। তিনির সামনে নিচে ১ খানা টুল পাতা আছে। আমরা দুই বন্ধু ঐ টুলের উপর উপবেশন করিলাম। তারপর ঐ মহাপুরূষের চোখের দিকে যেমন লক্ষ্য করিলাম অমনি একটি আলোর ঝলকানিতে আমার চোখ যেন ঝলসিয়া গেল। মাথা ঘুরিতে শুরু করিল (বিদ্যুৎ চমকার মত) অনেকক্ষন মাটির দিকে তাকাইয়া থাকার পর সাবেক ভাব আসিল। কিছু সময় পর মহাপুরূষ তাঁহার আসনে থাপর মারিলেন। সংগে সংগে আঙ্গিনার মধ্যে একটি ঝঙ্কার হইল,অমনি সকলে যোগ কর্ম্ম ছাড়িয়া দিলেন। তারপর আমাদেরকে জিজ্ঞাস করিলেন কি চান আপনারা? এত রাতে নদী সাঁতার দিয়ে আসিলেন কেন? জীবনের তো মায়া আছে? আমি বলিলাম,জম্মিলে মৃত্যু অবশ্যই হইবে। তারপর মহাপুরূষ বলিলেন,তরনী  আপনাদের বলেছে আমাদের বুড়া গোসাই এসেছে,তার বয়স ৪৫০ বছর,তাই দেখতে এসেছেন। আমি বলিলাম ঠিক বলেছেন। আপনার নাম কি? জম্মভূমি কোথায়? তিনি উত্তর দিলেন,নাম জীবানন্দ জম্মভূমি বীরভুম জেলায়। আমি বলিলাম আপনি কোন জীবানন্দ এবং আপনার বয়স কত? তদ্ উত্তরে উনি বলিলেন, কয়টা জীবানন্দের সন্ধান রাখেন আপনি? আমি বলিলাম দেখুন ইতিহাস পড়েছি তাতে দেখেছি,উগ্রসেনের রাজধানীতে কংসের কারাগারে দৈবকীর গর্ভে বাসুদেবের ঔরসে একটি ছেলে জন্মে তার নাম শ্রীকৃষ্ণ,সেই শ্রীকৃষ্ণ নাম অনুসারে ভারতে বহু হিন্দু ছেলের নাম রাখা হয়েছে শ্রীকৃষ্ণ, সে যে কত জন তা তো আমার জানা নাই। তবে একটি জীবানন্দ সম্বন্ধে বই পড়িছিলাম। সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিম বাবুর লিখিত “আনন্দ মঠ” যত বার পড়ি,তত বার আমার নতুন বলিয়া মনে হয়, আপনি কি সেই জীবানন্দ? তখন তিনি নিচ স্বরে বলিলেন,সে কি বেঁচে থাকিতে পারে? তখন আমি বলিলাম যুদ্ধান্তে তাঁরা কোথায় গেলেন? তিনি কোন উত্তর দিলেন না। প্রায় ৫শত বছর পূর্ব্বে ইতিহাসের যুদ্ধ বিগ্রহের কথা তুলে ধরিলাম। তার উত্তরে যাহা বর্ননা করিলেন,ইতিহাসে পড়িয়াও সেই জ্ঞান লাভ হইবে না। তখন তিনি বলিলেন যে,রাজ-স্ট্রেটের বিরুদ্ধে কোন কথা লিখিলে তাহা পুস্তক আকারে বাজারে প্রকাশ হবে না। ক্রমাগত দুই তিনটি যুদ্ধের কথা বলিলেন। তারপর তিনি আমাদের বিদায় দিয়া বলিলেন“আপনারা বাড়ী ফিরে যান”আমরা উভয়ে পূর্বের মত গামছা পড়িয়া নদী পার হয়ে বাড়ী পৌছি। তারপর ১৩৪৯ সনে সম্পত্তির ব্যাপারে সরিকদের সংগে মামলা মোকরদ্দমা সৃষ্টি হয়। লোক মুখে শুনিতে পারিলাম “জীবানন্দ” মহারাজ ধুনট থানার অধিন বিলকাজুলী গ্রামে ব্রজলাল তালুকদারে বাড়ীতে আসিয়াছেন। তারপর আমি তাহার নিকট সাক্ষাতের জন্য যাই। ওনার সম্মুখিন হওয়ার সংগে সংগে তিনি বলিলেন আগামী কাল্য ভোরে স্নান করিয়া আমার নিকট আসিও। আমি ফিরিয়া আসিলাম সন্ধ্যার দিকে। রাত্রিতে খাওয়ার পর ঘুমাইয়া পড়ি। হঠাৎ ঘুম ভাঙ্গিলে নদীতে গিয়া স্নান করিয়া আমি রাত্রী কতটা হবে,তখন আমি তাহা অনুমান করিতে পারি নাই,তার পর একা অন্ধকারের বুকে ৩ মাইল দূরত্ব অতিক্রম করিয়া বিলকাজুলী ব্রজলাল তালুকদারের বাড়িতে পৌছি। গভীর রাত্রি তার বাড়িতে কোন সাড়া শব্দ নাই। বাহিরে কাচারি ঘরে দরজা ধাক্কা দিলে তাহা খুলিয়া যায়। ভিতরে ঢুকিয়া দেখি জীবানন্দ মহারাজ,নন্দমতা,শুদ্ধানন্দ যোগে রত রহিয়াছেন। জীবানন্দ মহারাজ তার আসন হইতে ৪/৫ ফুট উপরে শূন্যের উপর যোগ কর্মে রত। ঐ রূপ দেখিয়া প্রথমে আমার মনে ভয়ের সঞ্চয় হয়। তৎপর ঐ স্থানে রাখা একখানি টুলের উপর বসি এবং বসা অবস্থা ২/২.৫০ঘন্টা কাটিয়া যায়। তারপর বাহিরে গিয়া রাত্রি সময় নির্দ্ধারনে চেষ্টা করি। আকাশে লক্ষ্য করি সাতটি তারার জোট,ঠিক মাথার উপর বা আকাশে মাঝামাঝি। তারপর ঘরে গিয়া বসি। অনুমান রাত্রি ১টার পর মহাপুরূষ স্বআসনে বসিলেন। তারপর আমাকে আদেশ করেন কমুন্ডলের জলদিয়া পা ধুইয়া আমার নিকট বস। আমি মহাচিন্তার মধ্যে পরিলাম,অগত্যা কমুন্ডলের জলদিয়া পা ধুয়ে উনির আসনে বসিলাম। তারপর আমাকে ৪টি আসন দেখাইয়া দীক্ষা দেন এবং বলেন “তোমাকে আজ হতে ছয় মাস নিরামিশ ভক্ষন করিতে হইবে এবং একা একা ঘরে অবস্থান করিতে হইবে ও ৪টি আসন সাধিবে। তিনি নির্দ্দেশ মত কাজ আরম্ভ করিলাম।তাহাতে আমার ১৪ নং মোকদ্দমা ডিগ্রী হল ৩মাসের মধ্যে। ৬মাস পর উনি আবার আমার বাড়ীতে আসেন। আমি তখন কবিরাজের ব্যবসা করি। আমাদের বাড়ীর সামনে নদীতে স্নান করতে গিয়া আমার মনের মধ্যে ঊদয় হয়;বাবার নিকট হতে একটি পেটেন্ট ঔষধের ফরমুলা নেব,সেই ঔষধ তৈরী করে বাজারে বিক্রি হবে। সেই ঔষধের লাভে অংশ ৪আনা হবে আমার চালান,বাদ ১২আনা থাকবে। ৬ আনা লাভের অংশ আশ্রমের বই ছাপাব। আর ৬ আনা লাভ আমার হবে। তা দিয়ে আমি ধনী হব।এই চিন্তা নিয়ে আমি স্নান করে বাড়ী আসিলাম। বাবা ঘরের মধ্যে বসে আছেন। ডাকলেন নিখিল এসেছো,আমি বললাম হ্যাঁ বাবা। কাপড় ছেড়ে আমার নিকটে এস । তারপর আমি তার সম্মূখিন হইলাম। তিনি বলিলেন টাকা নেবে? তখন আর আমার মুখে কোন কথা নাই। তখন তিনি বললেন,তোমাকে এক জালা সোনার টাকা,সোনার টাকা যা তুমি বংশ পরম্পরায় খেয়ে শেষ করতে পারবে না,যদি টাকা নাও তবে এসো,এই পর্যন্তই শেষ। বল এটা চাও না ঐ টা চাও। আর যা চাও, পাহাড়ে এক প্রকার গাছ আছে চিকিৎসার গাছের মত। সেই গাছের এক রতি ছাল খাইলে মানুষ অমর হয়।কিন্তু সেই গাছের নিকট কেহ যাইতে পারে না কারন বিষধর সর্প ঐ গাছ আচ্ছাদন করে থাকে। যে সেখানে যাইতে পারে তাঁর রসেই গাছের ছালের প্রয়োজন হয় না। আমি মন্ত্র মুগ্ধ হরিনের ন্যায় দাড়াইয়া রহিলাম,আমার কোন শক্তি নাই কি বলি। ঐ তারিখে ঐ পর্য্যন্ত শেষ হল। ২দিন অবস্থান করার পর ঊনি আমাকে সংঙ্গে করে পাবনা জেলার রাইগঞ্জ থানার অধিন নিমগাছী রওনা হলেন। তখন কার্ত্তিক মাসের শেষে ১ঘন্টা পরিমান বেলা আছে। ঊনি বললেন নিমগাছী গিয়া সময় হতে নিমগাছী প্রায় ১৬/১৭মাইল দুরত্ব,পেচীবাড়ী গ্রাম পার হওয়ার পর এমন ভাবে হাঁটা শুরু করিলেন যে আমি তাঁর পিছুপিছু দৌড়াইতে শুরু করিলাম। শুদ্ধানন্দ স্বামীও সংঙ্গে ছিলেন। উনি আগে মাঝে শুদ্ধানন্দ পিছনে আমি। তখন ঊনি শুদ্ধানন্দকে বলিলেন,রাম তুমি পিছনে যাও। রাম দাড়াইলেন,আমি দাড়াইয়া মধ্যে গেলাম,তখন মহাপুরূষ ডাক দিয়া বলিলেন,নিখিল চোখ বন্দ কর। তখন আমি চিন্তা করিলাম চোখ বুজিয়া কি প্রকারে রাস্তা হাঁটিব।চোখ বুজিবার সংঙ্গে সংঙ্গে কি ঘটিল বুঝিতে পারিলাম না। তারপর আমার কানে শব্দ এল নিখিল চোখ খোল। তারপর দেখলাম আমরা চান্দাইকোনা খেওয়া ঘাটের উল্টরপার দাড়াইয়া আছি। নৌকায় উঠিলাম। যেখানে চোখ বুজিয়া ছিলাম সেখান হইতে চান্দাইকোনা খেওয়া ঘাট প্রায় ৮মাইল(১৩ কি:মি:)। তখন আকাশের দিকে চাহিয়া দেখি বেলা ঐ অবস্থায় আছে। তৎপর নদী পার হইয়া করটিয়া গ্রামে কেলাশ প্রামানিকের বাড়ীতে উপস্থিত হন। তখন দেশে ম্যালেরিয়া জ্বর ঘরে ঘরে,ঐ বাড়ীর সবাই জ্বরে আক্রান্ত। উনি বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করিয়া এক হুঙ্কার ছাড়িলেন“এই তোরা না খেয়ে শুয়ে আছিস কেন? সবায় উনির সারা পেয়ে বাহিরে এলেন। কমুন্ডল হতে জল তাদের গায়ে ছিটাইয়া দিলেন। আর বলিলেন,তোরা স্নান করে রান্না করে খাওয়া দাওয়া কর। কাহারও আর জ্বর নাই। সবাই স্নান করে খাওয়া দাওয়া  করে তারপর মাঠ হতে গরু লইয়া বাড়ী আসিল। শুদ্ধানন্দ স্বামিকে বলিলেন (শুদ্ধানন্দ স্বামীজী রাম বলে ডাকিতেন) রাম দুধ দোয়া শুদ্ধানন্দ সেই অনুসারে কাজ করিলেন। তারপর আমরা করোতোয়া নদীতে স্বান করে এসে যোগকর্ম্ম বসে গেলাম। তারপর ঐ গ্রামে লোক জন অনেক আসিল কাহাকেও ডাকিতে হইল না। প্রায় রাত্রি ১২টা পর্যন্ত আলোচনা করিলেন। তারপর সবাইকে বিদায় দিলেন। কিছু সময় অতিবাহিত হইলে শুয়ে পড়ি,কিছু রাত্রি গতো হবার পর আমাকে ডাকলেন নিখিল উঠ কর্মযোগে বস। তারপর কর্মযোগ শেষ হলে বললেন,চলো নিমগাছী যাইতে হইতে হবে। একে রাত্রী কুয়াসাচ্ছন্ন প্রকৃতি তারপর তখন ঐ অঞ্চলে বাঘের উৎপাত খুব বেশী। চারিদিকে বাঘের ডাক শোনা যায়। আমি বলিলাম “বাবা আমি তো রাস্তা চিনি না। আমাকে বলিলেন চল,চিন্তার কোন কারন নাই। তারপর রওনা হইলাম। আমরা তিন জন। দক্ষিন দিকে কিছু দুর যাবার পর করোতোয়া নদী পার হই। অগ্রে বাবা মধ্যে আমি পিছনে শুদ্ধানন্দ। আমার মনে হল সামনে বাঘ ডাকে,আমার মনে ভয়ের সঞ্চার হল। অল্পদুরে অগ্রসর হবার পর দেখি দুটি বড় বড় বাঘ রাস্তার দুই পার্শ্বে  থেকে থোতা মাটিতে লাগাইয়া ডাকিতেছে। ঐ সময় আমার তো এক রকম প্রানহীন অবস্থা,বাবার নিকটর্বত্তী হয়ে পিছনে রহিলাম। উনি দুই বাঘের মাঝখানে দাড়াইয়া বলিলেন তোমরা চলে যাও আমার সঙ্গে একটি শিশু আছে। তখন বাঘ দুইটি ধান ক্ষেতের  মধ্যে চলে গেল, সেখান হতে বেশ কিছু দুর যাওয়ার পর এক জঙ্গলের মধ্যে সরু রাস্তা দিয়া নিমগাছী দুই মাইল উত্তরে বিরাট রাজবাড়ী আছে । বিরাট বটবৃক্ষ আছে ও একটি দিঘি আছে সেখানে। ঐ স্থানে গিয়া আমাকে বলিলেন এখানে প্রচুর টাকা আছে। টাকা উঠানো যাবে না,আমি বলিলাম কি প্রকারে জানিলেন যে এখানে টাকা আছে? তিনি বললেন ভূগর্ভে যাহা আছে তাহা দেখা যায় উপর থেকে,শুধু চক্ষু দৃষ্টি করিতে হয়। আরও বলিলেন তোমাকে তো এক জালা সোনার টাকা দিতে চাহিয়াছিলাম কিন্তু তুমি নিলে না। জুনাগর,মধুপুরগড়ে আর বীরভুমের জঙ্গলে রাখা হয়েছে। এ গুলি একদিন দেশের কাজে লাগিবে,গ্যাস দ্বারা বিশেষ ভাবে সংরক্ষিত রহিয়াছে। তারপর ওখান হতে রওনা হয়ে নিমগাছী বাজারের উপর পৌছি। সেখানে গিয়া বলিলেন,এখানে বহুপুর্ব্বে আসিয়া ছিলাম,তখন এটা বিরাট নগর ছিল(নিমগাছী একটি গ্রাম্য হাট)আমি বলিলাম,সেটি কত বৎসর পূর্বের কথা। তিনি আর কোন কথা বলিলেন না।নিমগাছী দক্ষিনে কাঞ্চন স্বর গ্রাম সেখানে আমার পিসাত ভাই যোগেন্দ্র নাথ দাম ডাক্তার চিকিৎসা ব্যবসা করিতেন।তার বাড়ী ছিল ইতি পূর্বে ফরিদপুর গ্রামে পাবনা।আমি ইতি পূর্ব্বে সেখানে গিয়াছিলাম। একদিন যোগেন বাবুর স্ত্রী একটি নোংড়া নেকরা দিয়া হারিকেনের চিপনি পরিস্কার করিতেছিলেন। তাহা দেখিয়া আমি বলিলাম যে,বৌদি পরিস্কার নেকড়া দিয়া চিমনি পরিস্কার কর না তাহা হইলে আলো দূরে ছড়াইয়া পরিবে,নইলে অল্প সময়ের মধ্যে কালি পরে আলো আর দুরে যাবে না। যোগেন বাবু ঘরের মধ্যে ছিলেন,তিনি আমাকে বলিলেন,নিখিল পরিস্কার নেকড়ার সদ্ধান করিতেছি। আজ ১০বৎসর যাবৎ,আজ পর্যন্ত পেলাম না। তদ্উত্তরে আমি বলিলাম পরিস্কার নেকাড়ার সন্ধান আমি জানি।এরপর তিনি আর আমি পশ্চিম পার্শ্বে ফুলজোর নদীর তীরে বসিলাম এবং আমি জীবানন্দ মহাপুরূষ সম্মন্ধে বর্ননা বলিলাম ।তার পর দিন আমি ধুনট চলে আসি এবং যোগেন বাবু রাত্রিতে স্বামীজির ধ্যান শুরু করেন। ৭ দিন ঐ ক্রিয়া করাতে স্বামীজি যোগেন বাবুর সম্মূখে এসে উপস্থিত হয়ে বলেন,যোগেন তুমি দীক্ষিত হও। তখন যোগেন বাবু বলেন পাষান ক্ষেত্রে(আমার) পরিষ্কার না  করে দীক্ষা দিবেন কি করে? তারপর আর তিনি নাই। এর পর উনি (যোগেন দাম) অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পরে যান। পরে বাড়ীর সবাই ঘুম থেকে উঠে তার শুশ্রুষা করেন। তখন আমাকে যোগেন দাম বিস্তারিত বিবরন লিখে পত্র দেন। তার কিছূ দিন পর যোগেন বাবু পুর্ব্বের ন্যায় ক্রিয়া করিতে থাকেন। ২সপ্তাহ করার পর স্বামীজী আবার উপস্থিত হন এবং ঐ দিন পূর্ব মত আলোচনা হয়। তারপর উনি অন্তঃধ্যান হন। তারপর যোগেন দা আমাকে পত্র দেন। আমি পত্র অনুসারে ফরিতপুর গ্রামে গেলে যোগেন দা আমাকে বলিলেন,আমি এখানে স্বামীজীর নামে আশ্রম করিব এবং ১২ বিঘা জমি ভিটা সহ আমার কাকা বিক্রয় করিবে। তখন আমার নির্দেশ মত ১২ বিঘা মাটি খরিদ করেন। স্বামীজীর নামে দলিল করিলেন।

আমার নির্দেশ মত বরাবর পরমহংস শ্রীশ্রী মৎ স্বামী জীবানন্দ মহারাজ মানব ধর্ম্ম প্রচারক সংঘ সহজাশ্রম ফরিদপুর সেবাইত যোগেন্দ্র নাথ দাম সাং-ফরিদপুর থানা-রাইগঞ্জ জেলা-পাবনা। অথচ স্বামীজীর সংগে সাক্ষাত নাই। তারপর আমাকে লিখিলেন“জমি খরিদ করিয়াছি,স্বামীজী আসিলে আমার সংগে সাক্ষাত করাও। এর মধ্যে স্বামীজি ধুনট আসিলেন। কিন্তু যোগেন বাবুর কথা আমার স্মরন নাই। স্বামীজী চলে গেলে আমার মনে হল। এই প্রকারে ২ বার ভুল হয়। তৃতীয় বারও তদরূপ চলে যাওয়ার ২০ মিনিট পর আমার যোগেন বাবুর কথা মনে পরিল। তখন সাইকেল নিয়া স্বামীজির সংঙ্গে সাক্ষাতের জন্য রওনা হইলাম। যাইতে যাইতে তিন মাইল পথ অতিক্রম করিয়া ব্রজলাল তালুকদারের বাড়ীতে উপস্থিত হয়ে বলিলাম,স্বামীজি এসেছেন? এই মাত্র এসে আমার সংঙ্গে আলোচনা করে,চলে গেলেন। পশ্চিম দিকে রাস্তায় দুই বাড়ীর পরেই তার সাক্ষাৎ পাবেন। পশ্চিম দিকে নদীর ধার পর্যন্ত যাওয়ার পর  অনেকেই জিজ্ঞাসা করিলে কেহই বলিতে পারে না। তখন খেওয়া ঘাটে গিয়া জিজ্ঞাসা করে,কোন খোজ না পাওয়ায় খেওয়া পার হয়ে,চকখানপুর গ্রামের দিকে রওনা হলাম। (চলতে থাকিবে)

ওখান হতে ১মাইল দুরত্ব খানপুর গ্রাম,জীবনে সেখানে কোন দিন যাই নাই। তবে জানি ঐ গ্রামে মধুসাধুর বাড়ী। তাড়াতাড়ি সেখানে উপস্থিত হইয়া মধুসাধুকে জিজ্ঞাসা করিলাম। উনি বলিলেন এই মাত্র মাত্র আলোচনা করে,রওনা হলেন পশ্চিম দিকে এক বাড়ী পরেই তাকে পাবেন। আমি তাড়াকরে সাইকেলে চড়িয়া পশ্চিম দিকে রওনা হলাম কয়েক বাড়ী পরেই বড় মাঠে মধ্যে রাস্তা তাঁর সাক্ষাৎ হল না। সামনে একটি বটবৃক্ষ পাইলাম সেখানে সাইকেল রাখিয়া বটবৃক্ষের শিখড়ের উপর বসিলাম এবং সংগে সংগে কয়েকটি টিকটিকি একসঙ্গে ধ্বনি করিয়া উঠিল।আমার শরীর অবসাদ হয়ে গেল। তারপর বাড়ীর দিকে রওনা হলাম। ঐ সময় হইতে তিন/চার মাস পর বাবা আমাদের বাড়ীতে আসিল। তারপর যোগেন বাবুর কথা বলিব আর স্মরন নাই। উনি বলিলেন নিখিল তুমি মরিচিকার পিছনে ছুটে ছিলে কেন? আমি তো আগে আগে গেলাম। আমি বলিলাম দেখা দিলেন না কেন? যাক আরও কিছু দিন পর স্বামীজী বিলকাজুলী ব্রজলাল তালুকদারের বাড়ীতে আসিলেন,তখন আমি সংবাদ পাইয়া সেখানে গেলাম। স্বামীজী বলিলেন,ফরিদপুর গ্রামের যোগেন কে সংবাদ দাও। লোক পাঠাও ধুনট হইতে দক্ষিনে প্রায় ১৮ মাইল দূরে যোগেন দার বাড়ী,তিনি সংবাদ পেয়ে দলিল সহকারে ধুনটে চলে এলেন। ঐ দিন সকালে স্বামীজী আমাদের বাড়ী আসিলেন। আমাকে বলিলেন,আমি গুর্জ্জিয়া গ্রামে তরনী সরকারের বাড়ীতে গেলাম। যোগেন আসিলে সঙ্গে করে আমার নিকট যেও। তারপর বেলা প্রায় ১২ টার মত যোগেন আমাদের বাড়ীতে আসিলেন,এরপর যোগেন দা সঙ্গে নিয়ে আমি গুর্জ্জিয়া বাবার নিকট গেলাম। যোগেন দা দলিল খানা বাবার পায়ের উপর রেখে কান্না শুরু করিলেন। বাবা বলিলেন “সময় না হলে আশা পুরন হয় না। তুমি জমি খরিদ করেছ কেন? তুমি খরিদ করেছ তুমি ভোগ কর। তখনই কর্ম্ম দিলেন যোগেন দাকে। তারপর যোগেন দা খরিদ ভিটার উপর আশ্রম তৈয়ার করেন। স্বামীজি,শুদ্ধানন্দ কাকা ও আমি ঐ আশ্রম উদ্ধোধন করে আসে। যাক তারপর আমাকে সঙ্গে করে অনেক অজানা জায়গায় নিয়ে যান এবং সঙ্গে রেখে কর্ময়োগ এবং চলার পথে বহুপ্রকার আলোচনা ও উপদেশ দিতে থাকেন।আমি তাকে চিনেও চিনতে পারি নাই। আমি হারিয়ে ফেলেছি ভাই! আজ আমি কোথায়? কেই বা তার উত্তর দিবে? চারিদিকে সবাই আমার নিকট চায়-আমাকে কেউ তো কিছু দেয় না। কি লিখিব এক তারিখে স্বামীজি ধুনট থানার অধিন মাটীখোরা গ্রামে রহিজ উদ্দিন সরকারের বাড়ীতে যান এবং বর্হিঃ বাটিতে কাচারি ঘরে বসেন। রাতে আলোচনা করেন রহিজ উদ্দিন আমার বাল্য বন্ধু,স্বামীজীকে থাকার জন্য ঐ ঘরে ব্যবস্থা করেন ঘরের চারিদিকে টিনের বেড়া এবং  রহিজ উদ্দিন তালা মেরে বাড়ীর ভিতরে শয়ন করে। তালা মারার কারন বাবা যেন ঘর থেকে চলে না যায়। পর দিন সকালে ঘরের তালা খুলে দেখেন সাধু নাই,চলে গেছেন কেমন করে। রহিজ ভাই আমাকে এসে বললেন তোর গুরু গত রাত্রে আমার এখানে এসেছিলেন। তিনিকে পরীক্ষা করিবার জন্য ঘরে তালা মারি,পরদিন সকালে দেখি,তিনি আর কাচারিতে নাই। ভাই আমি তো তাঁর কাছে অন্যায় করেছি,তাই আর দেখা দেন নাই। আর এক তারিখে স্বামীজী নন্দমা সহ সকালে আমার বাড়ীতে এলেন কিন্তু থাকলেন না। বাবা আমাকে বলে গেলেন,নিখিল তোমার এখানে বৈকালে একজন ভদ্রলোক আসিবেন। তাকে সঙ্গে করে তুমি গুর্জ্জিয়া গ্রামে তরনির বাড়ীতে আমার সঙ্গে দেখা করিবে। তরনি সরকারের বাড়ী আমাদের বাড়ী হইতে ১মাইল দুরে অবস্থিত সন্ধ্যার পূর্ব্বে আমি স্নান করে বসে রহিলাম কোন লোক নাই। তারপর সন্ধ্যা ঘনায়ে এল হঠাৎ এক ভদ্রলোক সাইকেল সহ এসে উপস্থিত হলেন,সাদা ধুতী পরা পাঞ্জাবি গায়ে,পাম্প সু পরা পায়ে,উহা চওড়া ফরসা,স্বাস্থ্যবান। এসে বললেন এখানে জীবানন্দ মহারাজ আছেন। উনি কে দেখে আমার সন্দেহ হল। জিজ্ঞাসা করলাম,নাম ঠিকানা বাড়ীর কথা,উত্তরে বললেন ‘‘আমি পাবনা জেলার সিরাজগঞ্জ মহুকুমার বেলকুচি থানা থেকে আসিতেছি। তখন আমি বলিলাম তিনি এখানে নেই। সংগে সংগে বলিলেন কোথায় আসেন তিনি, আমাকে দয়া করে  তাঁর সঙ্গে সাক্ষাত করান। উনির আকুতি মিনতি ভাব দেখে আরো জিজ্ঞাস করি,তিনি বলিলেন আজ ভোরে আমি সলপ ষ্টেশনে নামি, ৪/৫ মাইল দুরে  আমার বাস্ত-ভিঠা,সিরাজগঞ্জ থেকে প্রায় ১০ মাইল দুরে রাজাপুর গ্রামে,আমার নাম সুখদা শিখর রায় বর্তমানে কলিকাতায় দমদম বাস করি। বাড়ী এসে শুনি জীবানন্দ মহারাজ চন্দনগাতী লঙ্কেশ্বর  সরকারের  বাড়ী এসেছেন,তখন কাল বিলম্ব না করে  সাইকেল নিয়ে চন্দন গাতী ৪/৫ মাইল দুরে  সেখানে উসস্থিত হই। সেখানে গিয়া শুনি,উনি বগুড়া জেলায় ধুনট থানার অধিন বিলকাজুলি গ্রামে ব্রজলাল তালুকদারে বাড়ী গিয়াছেন। তখন কাল বিলম্ব না করে সিরাজগঞ্জ অভিমুখে যাত্রা করিলাম ঐ স্থান অর্থাৎ সিরাজগঞ্জ হইতে ৮ মাইল বাকবাড়ী গ্রাম। সেখানে আমার এক আত্মীর জমিদার বুদু রায়ের বাড়ী এসে স্নান আহার করি। তার পর উনির নিকট হতে বিলকাজুলির রাস্তার বিবরন নিয়ে ৮ মাইল দূরে সোনামুখী বাজারে পৌঁছি। সেখান থেকে ৫ মাইল দূরে  বিলকাজুলী গ্রামে ব্রজলাল তালুকদারে বাড়ীতে যাই। সেখানে পৌছিয়া জিজ্ঞাসা  করি “জীবানন্দ” মহারাজ আছেন। উত্তরে উনি বলিলেন আজ সকালে এসেছিলেন। বর্তমানে উনি ধুনট গ্রামে নিবাসী শ্রী নিখিল গোবিন্দ দত্ত মহাশয়ের বাড়ীতে আছেন। এরপর এখানে এসেছি। উনির কথা শুনে আমার খুব কষ্ট হল। তিনি বললেন আজ ১৬ বছর যাবৎ উনার সংগে দেখা করার জন্য ছুটিতেছি কিন্তু দেখা হয় নাই। আপনি আর আমার সংগে প্রতারনা না করে তার কাছে নিয়ে চলুন। তখন আমি বলিলাম আপনি পরিশ্রান্ত বিশ্রাম করে কিছূ খেয়ে চলুন আমার সঙ্গে ,আমি আপনাকে তার সঙ্গে দেখা করাই। তখন উনি আমার হাত চেপে ধরে বললেন ভাই বিশ্রাম নিব না বা খাবও না,আপনি চলুন। তখন উনিকে নিয়ে রওনা হইলাম রাস্তা চলার পথে দারুন বক্তৃতা শুরু করলেন,বললাম চলুন ঐ খানে গিয়ে সব কথা হবে। আমাকে বলে কোন লাভ হবে না। তরনি দার বাড়ী পৌছিলাম। বাড়ীর মধ্যে পশ্চিম দুয়ারী ঘরে বসে আছেন বাবা,বললাম ঐ দেখন “জীবানন্দ’’ মহারাজ বসে আছেন। তিনি অবাক ভাবে দেখলেন,তার হাতের সাইকেল খানা মাটিতে পরে গেল। তারপর দৌড়ে গিয়ে বাবার পায়ের উপরে পরে গেল। বাবা বললেন কালু এসেছিস,কাল পূর্ন না হলে কোন কাজ হয় না। তখনি বাবা হুকুম দিলেন তরনি জল আন,পা ধুয়ে এস। উনি হাত মুখ ধুয়ে এসে বসলেন,তৎক্ষনাৎ বাবা তাকে কর্ম্ম দিয়ে দিলেন এবং বললেন এক সপ্তাহ পর তোর বাড়ীর কাগজ পত্র দিয়ে আসব। কি কাগজ পত্র তা আমি জানি না। পরদিন সকালে চলে গেলেন। আর একদিন দূর্গা পুজার কয়েকদিন পূর্বে সকালে বাবা আমাদের বাড়ী হইতে পূর্বে দিকে রওনা হলেন। বেলা আনুমান ৮ টার মত ,যাবার পথে সামনেই নদী পার হতে হয়। সেখানে  কোন নৌকা নেই। আমি আমাদের বাড়ীর সামনে বড় একটি আমগাছে উচু ডালে উঠে গতিবিধি লক্ষ্য করিলাম। স্বামীজী নদীর ধারে গিয়ে জলের উপুর দিয়ে অপর পারে চলে গেলেন। এরপর কিছু সময় পর দৃষ্টির অন্তঃরালে চলে গেলেন। তৎপর অনুমান দুই মাস পর আবার আমাদের ধুনট গ্রামে আমার বাড়ীতে এলেন। আমি জিজ্ঞাস করিলাম ঐ তারিখে আপনি কোথায় গিয়াছিলেন। তদ্ উত্তরে তিনি বলিলেন“ভক্ত কি তোমরাই না আরো আছে। ময়মনসিংহ জেলায় কিশোরগঞ্জ মহুকুমার অধিন(গ্রামের নাম মনে নাই)এক ধনী লোকের বাড়ী দুর্গা পুজা হয়,কুমার প্রতিমা গড়াইয়া তাহার চক্ষুদান করে মাটির প্রতিমার সামনে কর্ম্মে বসে যায় এর পরে কুমারের সমাধি এসে যায়। সমস্ত রাত্রি অতিবাহিত হয় কুমার কোন নড়াচড়া করে না এক ভাবে বসে আছে। তখন বাড়ীর মালিক ও অন্যান্য লোকজন ডাকাডাকি শুরু করে এবং এক পর্যায়ে ধাক্কা দিলে দেহ মাটিতে পড়ে যায়। পরে ডাক্তার আসিয়া পরীক্ষা করে মৃত বলে সনাক্ত করে “তখন ঐ বাড়ীর কি অবস্থা চিন্তা  কর” মৃত ব্যাক্তির মরদেহ সৎকার করিবার ব্যবস্থা চলিতেছে। এমন সময় (আমার ভাষায়)স্বামীজি সেই খানে উপস্থি’ত।তিনি হুঙ্কার দিয়া বলে যে তোমরা তাজা মানুষ পোড়াইবার জন্য উদ্যত হয়েছ! তোমরা সবাই শবদেহের চারিদিকে কর্মে বসে যাও। তার কথা মতে কাজ করিল সবাই। কিছু সময় পর সেই কুমার উঠে বসিল।

ঠিক এই রূপ একটি ঘটনা স্বামাজী আর এক তারিখে বলেছিলেন। কোন এক স্থানে নদীর তীরে বটবৃক্ষের নীচে উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। ভক্তমন্ডলি সহ এক সাধু বটবৃক্ষের নিচে বসিয়া আছেন। এমন সময় সাধু আসন ছাড়িয়া মাটিতে ঢলিয়া পরিলেন । ভক্তমন্ডলী মধ্যে বিরাট আলোড়ন সৃষ্টি হইয়া গেল,লক্ষ্য করে দেখা  হইল সাধু মারা  গেছেন। শিষ্যমন্ডলীর মধ্য কান্নাকাটি বিরাট বিষাদ যোগ শুরু হইল। তৎপর উৎসব আর হইল না,সকলে সিদ্ধান্ত লইল  দেহটাকে ভষ্ম করা হইবে। উৎসবের খড়ি লইয়া এবং শব দেহটি  লইয়া সকলে প্রস্তুত হইল শ্মশ্মানে লইয়া যাইবে। এমন সময় সাধু তার আসনে উঠে বসিলেন। তার জামাকাপড় ভেজা স্নান করা আবস্থা। সাধু বলিলেন তোরা কি করিতেছিস? সকলে তো অবাক। কাহারো মুখে কোন কথা নাই। তৎপর কোন এক ভক্ত বলিলেন “আমরা মনে করিলাম আপনি তো মারা গিয়াছেন ”দেহ টা সৎকারের ব্যবস্থা করা দরকার। সাধু তখন বলিলেন,তোদের মত আরো ভক্ত তো আমার আছে। কোন ভক্ত স্ত্রী-পুত্র সহ নৌকা যোগে এখানে উৎসবে আসিতেছিল। হঠাৎ নৌকা ডুবে গেল। সবাই প্রাণপনে আমাকে স্মরন করেন,প্রভূ তুমি কোথায় আছ,আমাকে বাঁচাও। তখন কি আর আমি এখানে থাকতে পারি। এখান হতে গিয়া নৌকাসহ ভক্তদের চরে তুলিয়া দিয়া আসিলাম এর মধ্যেই তোরা চঞ্চল হয়ে পরেছিস। কিছুক্ষন অতিবাহিত হবার পর সেই নৌকা ডুবি ভক্ত আসিয়া গুরুজীর পায়ের উপর পরিল।

আরও একটি ঘটনা। সতীশ চন্দ্র সরকার নামক এম এ বি এড উকিল ধুনট নিবাসী ১৩৫১ সনে তিনি কলিকাতায় কর্পোরেশনে চাকুরী করিতেন দেশ প্রেমিক কংগ্রেস দলের ও নেতাজী এবং গান্ধীজীর ইত্যাদি দলের সঙ্গে কাজ করিতেন। তিনি বাড়ীতে আসিয়া আমাকে জীজ্ঞাসা করিলেন “নিখিল তুমি জীবানন্দের ছাত্র হইয়াছ,আমি বলিলাম গীতোক্ত প্রাণকর্ম গ্রহন করিয়াছি। তখন তিনি বলিলেন,তার লিখিত কোন বই আছে। আমি বলিলাম আছে ,তখন আমি “জীবানন্দ পন্থা ’’ ১ম ও ২য় খন্ড বই দুই খানা তার হাতে দিলাম। তিনি ২য় খন্ড বইটি পড়িতে পড়িতে বাড়ীর দিকে রওনা হলেন। কিছু দূর বাড়ীর দিকে  অগ্রসর হয়ে ফিরে এসে বই দুখানা আমার দিকে ছুরে ফেলে দিলেন এবং বলিলেন তুমি এক মুর্খ আর তোমার গুরুদেব আর এক মুর্খ । ঐ কথার জবাবে আমি বলিলাম যে,বলিতেছেন যে,আমি মুর্খ আর তিনি এক মুর্খ। তখন তিনি আমার সঙ্গে ঝগড়া বাধে,তিনি মুর্খ হলেন কেমন করে। তদ উত্তরে সতীশ সরকার বলিলেন যে,২য় খন্ডে বইতে তোমার গুরু লিখিয়াছে,লেখাপড়া না শিখে পন্ডিত হওয়া যায়। এই কথাটির অর্থ কি? এই কথা লেখাতেই ভদ্রলোকের রাগ। তার উত্তরে আমি বলিলাম প্রাচীন ভারতে মনি ঋষিরা কোন স্কুল কলেজে পড়েছে? স্কুল কলেজ সুরু হয়েছে কোন রাজার রাজ্যে,সেই হল বিটিশ রাজত্বে ,আর আপনি এম এ পাশ করেছেন কিন্তু আপনার বর্ন পরিচয় হয় নাই। ভীষণ রাগ আমার উপর,আমি বলি শুনেন আপনি বা আমি ব্যাকরণ পড়েছি। স্বরবর্ণ আপনা আপনি উচ্চারিত হয়। কিন্তু ব্যাঞ্জন বর্ণ স্বরবর্ন ছাড়া উচ্চারিত হয় না। কিন্তু আমি দেখি ব্যাঞ্জন ছাড়া স্বর উচ্চারিত হইতে পারে না। ব্যাঞ্জন প্রাণ আর স্বর শব্দে আওয়াজ বুঝায়। আমার উপর নানা রূপ কথা বলিতে বলিতে বাড়ী চলে গেলেন। পরের দিন যজ্ঞেশ্বর বাবুর বাড়ীতে(যজ্ঞেশ্বর সাহা আমার গুরু ভাই)কন্টলের দোকানের চিনি আনার জন্য সতীশ সরকার গিয়াছেন। ঐ দিন আবার স্বামীজি যজ্ঞেশ্বর  সাহা মহাশয়ের বাস ভবনে উপস্থিত। স্বামীজি তখন বর্হিবাটিতে উঠানে পায়চারী করিতে ছিলেন। সতীশ বাবু জিজ্ঞাসা করিলেন উনি কে? ওখানে যে লোক বিদ্যমান,সে উত্তর দিল উনি বাবুর গুরুদেব“জীবানন্দ’’ মহারাজ। তখনি  সতীশ বাবু স্বামীজির সম্মুখিন হয়ে বলিলেন “আপনাকে একটি কথা জিজ্ঞাস করি “সংগে সংগে স্বামিজী বলিলেন,তা আপনি একটি শিশুর সংগে তর্ক করিতে গেলেন কেন? তখন সতীস বাবু বলিলেন আপনি মহাত্মা গান্ধিজীর সমালোচনা করেছেন। স্বামিজী তার উত্তরে বলিলেন গান্ধিজীর কতটুকু অধিকার রাখেন আপনি। তার উত্তরে সতীশ বাবু বলিলেন আমি গান্ধিজীর নেতাজী সুবাস বসু ইত্যাদির সংগে রাজনীতি করেছি। স্বামিজী তার উত্তরে বলেছেন তাতো করেছো,সুরাটে মিটিং করা কালিন আপনাকে বিরোধী দলের লোক গুলী করেছিল তখন কে আপনাকে উচু করে পিলারের আড়ালে নিয়া প্রাণ রক্ষা করে,মনে আছে। তখন সতীশ বাবু শুধু বলেন আপনি কে,এ ছাড়া আর কোন কথা সতীশ বাবু বলিতে পারে নাই। পরে সংবাদ পেয়ে যজ্ঞেশ্বর বাবুর বাড়ীতে গিয়ে আমি সমস্ত ঘটনা জানিতে পারিলাম।

আর এক ঘটনায় স্বামিজী,নন্দমাতা ও আমি ফরিদপুর (পাবনা জেলা) যোগেন বাবু ,যে আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন সেখান হইতে রওনা হয়ে উত্তরে রায়গঞ্জ থানার আভিমুখে যাইতে লাগিলাম সামান্য বেলা থাকিতে ফরিতপুর হইতে রওনা হইয়াছি। ফরিতপুর হইতে রায়গঞ্জ থানার ২ মাইল থানার নিকটবর্ত্তী হওয়ার পূর্বেই অন্ধকার নামিয়া আসিল,রায়গঞ্জ খেওয়া ঘাটের নিকট পৌঁছিলাম কিন্তু খেওয়া না উঠে ওখান হতে সামান্য উত্তরে লাহাড়ী জমিদারের বাড়ী ছিল,নদীর ধারে জঙ্গলের মধ্যে ছোট একটি রাস্তা আসে,লক্ষ লক্ষ জোনাকি পোকা উড়িতেছে ঐ স্থানে নদীর মধ্যে বিরাট (গভীর জলের খাদ) অন্ধকারের বুকে স্বামিজী ঐ খাদের মধ্যে নিচে নেমে গেলেন। চারদিকে অন্ধকার সেখানে গাছের সহিত একটি নৌকা বাধা ছিল,নৌকাটি না ধারে আমাদের নিকট নিয়ে এলেন,না নৌকায় উঠিলেন। আমি এক রকম ঐ অন্ধকারে জঙ্গলে চোখ বুজিয়া ৫/৬ হাত নিচে নামিলাম নৌকায় উঠিলাম। নৌকায় কোন নৌকা চালবার মত বৈঠা বা লোগা ছিল না। নৌকা একাকি রওনা হল, নদী পার হলাম। উনি আমাকে নামিতে আদেশ দিলেন। আমি বলিলাম নৌকা খানা এখানে রাখা কি ঠিক হবে। উনি আমাকে চরের মধ্যে দেরি করাতে বলিলেন এবং নৌকা যথাস্থানে রাখিয়া উনি চলিয়া আসিলেন,তারপর তিন জনে রওনা হলাম। ওখান হতে ১মাইল উত্তরে বেড়া বারজিয়া গ্রামে দিনেশ সরকারের বাড়ীতে উপস্থিত হলাম। রাত্রে ভীষন ঝড় হয়ে গেল। সেই ঝড়ে গ্রামের ব্যাপক ক্ষতি হইলেও সরকারের বাড়ীতে কোন ক্ষতি হয় নাই। সকালে দিনেশ সরকার রান্নার সব জোগার করিলেন ,এমন সময় নন্দমা বলিলেন এখানে থাকা যাইবে না তারপর ঐ গ্রামে অন্য বাড়ীতে উপস্থিত হইলাম(তিন জনেই)। তারপর শুনিতে পারিলাম দীনেশ সরকারের কুলবধূ একটি মৃত সন্তান প্রসব করিয়াছে। তারপর দিন ভোরে ওখান হতে রওনা হলেন। আমি উনির পিছু পিছু যাইতেছি। একটি হিন্দুপল্লীর নিকট হরিবাড়ী নামক একটি দেবস্থান। সেখানে এসে আমায় বললেন নিখিল বাম দিকে চাপ দিয়ে শুয়ে পড়। ঘাসের উপর বৃষ্টির জল ও কাদা । তার মধ্যে শুয়ে পরিলাম। উনি আদেশ দিল কান মাটির সংগে লাগাইয়া দাও। উনির নির্দেশ মত করিলাম তারপর ওঠার আদেশ দিলেন এবং বলিলেন কিছু বুঝিলে এখন আমি উত্তরে বলিলাম বুঝিলাম।(যাহা বুঝিলাম তাহা ব্যাখ্যা করা কঠিন)কিছু দুর এক জলাশয় হইতে কাপড় ধুয়ে নিতে বলিলেন। তারপর রওনা হলেন,ওখান থেকে ১ মাইল দুরে চান্দাইকোনা মোকাম,তখন জৈষ্ঠ্য মাস নদীর ধারে আবস্থিত হাইস্কুলের নিকট খাল,১পয়সা দিয়া খেয়াপার হয়ে আমরা যাইতেছি। বাবা আগে মধ্যে নন্দমা পিছনে আমি। তখন হাট খোলার দোকান সব খুলিতেছে। এক দোকান ভিতর হতে কোন এক লোক বলিয়া উঠিল আজকাল সালা বৈরাগীরা বৈষ্ণবী ছাড় তো চলেই না। আবার সেই সংগে নিয়েছে এক যুবক ছেলে টোপলা বই বহিবার জন্য। ঐ কথাটি আমার মনে খুব আঘাত দিল এবং কথার উত্তর দেবার জন্য আমি দাড়াইয়া গিয়াছি। বাবা হুংকার ছেড়ে বলিলেন ‘নিখিল চলে এস’ হাতী চলে যায়,কুকুর পিছনে ঘেউ ঘেউ করেই থাকে,হাতী ফিরেও চায় না। আর আমার উত্তর দেওয়া হল না। তারপর চান্দাইকোনা খেওয়া পার হয়ে প্রায় ৭/৮ মাইল উত্তরে পেচিবাড়ী সুরেন সরকারের বাড়ী পৌছিলাম।(এই ঘটনা এই পর্য্যন্তই আর লিখিলাম না)। আর এক ঘটনা আজ হতে প্রায় ৪৫ বৎসর পূর্বের ঘটনা। স্বামীজি আমার ঘরের মধ্যে বসে ১/২ তা কাগজে কি যেন লিখিলেন। আমাকে স্বামীজি বলিলেন প্রভাত বাবু কে ডেকে আন। প্রভাত বাবু তখন ধুনট হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক আমি তাকে ডেকে আনলাম। স্বামীজি প্রভাত বাবুর হাতে কাগজ খানা দিয়ে বলিলেন,এই কাগজের লেখনী ইংরেজী করে দিন। প্রভাত বাবুর কাগজ খানি পড়ে,কিছু সময় স্থির থেকে বলিলেন আমার দ্বারা এই কাগজের লেখনী করা অসম্ভব আমাকে ক্ষমা করবেন। তারপর তিনি চলে গেলেন। তারপর আমাকে বললেন হাইস্কুলের পন্ডিত মহিমা রঞ্জন চক্রবত্তী কাব্যতীর্থ কে ডেকে আন। আমি তাকেও ডেকে আনলাম। স্বামিজী তার হাতে কাগজ দিয়ে বলিলেন এটি সংস্কৃত করে দিন বোম্বাই ধর্ম সভায় পাঠাবো। তিনি ও কাগজ খানা পড়ে হতাস হয়ে গেল এবং বললেন আমায় দ্বারা কোন মতেই সম্ভব নহে,আমাকে ক্ষমা করবেন। তারপর উনিকে বিদায় দিলেন। এরপর বাবা জীবানন্দ বিকাল বেলা চলে গেলেন। কোথায় গেলেন বা কি করলেন ঐ লেখনি তা আমাকে বলেন নাই। আমি কর্ম গ্রহন করিবার ছয় মাস পরের ঘটনা আর এক দিন আমি স্বামিজী ও শুদ্ধানন্দ তিন জন নিমগাছী গিয়াছিলাম। ফরিদপুরের যোগেন দাম যিনি আশ্রম করেছিলেন,তিনি নিমগাছী কাঞ্চনেশ্বর এ হোমিও ডাক্তারী করিতেন। তার বাড়ীতে আমরা উপস্থিত হইলাম। এমন সময় একটি গাই মহিষ সহ ৪/৫ জন লোক ওখানে আসিল। তারা বলে আমরা এই মহিষ খরিদ করিলাম,বিক্রি কবলা লেখার লোক পাইলাম না,আপনি আমাদের কাজটি করিয়া দিলে উপকার হইত। বেলা আনুমান ১০ টা  ঘরের মধ্যে জীবানন্দ ও শুদ্ধানন্দ বসে ছিলেন। বাবা হুকুম দিলেন নিখিল কবলা খানা লিখে দাও। আমি কোবলা খানা লিখে দিলাম এবং তারা দক্ষিনা বাবদ আমাকে দুইটি রুপার টাকা দিল। আমি টাকা পেয়ে খুব খুসী হলাম এবং মনে মনে ভাবিলাম আজ কাঞ্চন স্বর হাট সেখান হইতে ২টাকার অনুপাম কলা কিনিয়া খাইব। এরপর স্বামিজী ইন্দারায়(কুয়ায়) স্নান করিয়া আসিতে বলিলেন। আমি ইন্দারায় স্নান করে কাপড় খুলে ইন্দারায় জলে পরিস্কার করে নিতে(টাকা ২টি কোমরে কাপড়ে রাখিয়া ছিলাম)রূপার টাকা ২টি ইন্দারায় পরে গেলো। মনটি খুব খারাপ হল,মনে মনে ভাবিলাম ইন্দারায় নামিয়া টাকা ২টি তুলিয়া আনি,কিন্তু না । তারপর স্নান করে বাবার নিকট এলাম। বাবা বলিলেন টাকা ২টি ইন্দারায় রেখে এলে। কলা খাওয়ার জন্য তোমার এত সখ। ঐ লোক গুলি ডাকাতি করে টাকা এনেছে, এসে সেই টাকা নিয়ে মহিষ কিনেছে এবং সেই টাকার অংশ তোমাকে দিয়ে গেল। কাজেই টাকা ২টি হারিয়ে গেল,তারপর বৈকালে জগদীশ নামে এক লোককে স্বামীজি বলিলেন,৮/১০ সের দুধ রাখা যায়,এমন একটি বালতি এনে এখানে রাখ। ঐ বাড়ী হইতে ৪/৫ বিঘা পরই হাট,হাটে প্রচুর অনুপম কলা আমদানি হয়। হাট হতে কলা খরিদ করে,লোকজন স্বামীজির সম্মুখে রাখিয়া যাইতে লাগিল আর ঐ বালতি মধ্যে দুধ আনিয়া দিতে লাগিল। সন্ধ্যার পর দেখা গেল,বালতিটি ভরে এল,কলা প্রচুর জমা হইল। বৈকালে প্রায় ৩ ঘটিকায় সময় আমার পিসাতো ভাই খুদিরাম দাস,আসিয়া আমাকে নিমন্ত্রন করিল এবং বলিল দুই সের মাংস  নিয়াছি,রাতে দুই ভাই এক সঙ্গে খাব এই বলে,তিনি হাটে চলে গেলেন। তারপর স্বামীজি আমাকে ডেকে বললেন,খুদিরাম তোমাকে নিমন্ত্রন করে গেল ”মাংস দিয়ে খাওয়া দিবে। কিন্তু তোমার ভাগে পুটি মাসের ঝোল,চটচটি ও ভাজা। কথাগুলি মনের মধ্যে গাঁথিয়া রাখিলাম। খুদিরাম দা সেই হাঠে গিয়া অনেক গুলি পুঁটি মাছ ক্রয় করেন। অবশ্য বড় মাছ লোক মাফৎ বাড়ীতে পাঠায়ে দেন। সন্ধার সময় বাবা হুকুম দিলেন জগদিশকে তোমার বাড়ী হইতে খেজুরের গুড়,আতপ চাল,আর বড় কড়ই হাতা আর কিছু কলার পাতা আনিতে,সন্ধ্যার পর ভক্তরা আসিবে,তাদের খেতে দিতে হবে। বাবা আমাকে বলিলেন ১/২ সের দুধ আলাদা করে,রেখে অবশিষ্ট দুধ দিয়ে তুমি পায়েস রান্না কর এবং তুমি যে কয়েকটি কলা খাইতে পার,রাখিয়া সবাইকে একটি করিয়া দিবে। রাত্রি তখন অনুমান ৯ টা খুদিরাম দা আসিল,পায়েস রান্না হল, ঠিক সেই মুহূতে ছোট বড় মিলিয়া ১৫০ জন লোক উপস্থিত হইল। প্রত্যেকে এক ছোট বাটি পায়েস ও একটি করে কলা দেওয়া হইল। সকলে পেট ভরে পায়েস খেয়ে চলে গেলে,কলা আমার জন্য ১টি বাঁচিল। রাত্রি প্রায় ১০টার দিকে বাবা বলিলেন ভিক্ষা(নিমন্ত্রন)রক্ষা করে,রাত্রীতে আর এখানে আসিবে না। আগামী সকালে আসিবে। ওখান হতে গন্তব্য স্থান ১মাইল,সেখানে গিয়া খাইতে বসিলাম,বৌদি খেতে দিলেন ৪ টুকরা পুটি মাছ ঝোল,৪ টুকরা চটচটি আর ৪ টুকরা ভাজা(বড় পুটি দুই টুকরা করেছে)চিন্তা করে দেখি ১২ খানা মাছ ,২ সের মাংস দুই জন খায় কেমনে? বৌদি তো মাংস খায় না। তখন বৌদি কে বলি মাছ খেয়েই যদি পেট ভরে তবে মাংস খাব কোথায়? আজ ৬ মাস পর মাংসের নিমন্ত্রন। বৌদি ঐ উত্তরে যাহা বলিলেন,তাহা নিজের ভাষায় বলি দাদা যে বাড়ীতে থাকেন বৌদি সমেত সেই বাড়ীর গিন্নি বৌদির সংগে ঝগড়া বাধায়,কারন তারা মাংসের ভাগ পায় নাই। তাদের কথায় মাষ্টার আমাদের বাড়ীতে থাকেন আর আমাদের মাংসের ভাগ দিল না। একা খাবেন সে দুই সের মাংস । নানারূপ কথায়  বৌদি মাংস তাদের দিয়ে দেয়। আবারও উল্লেখ করি “৬ মাস পর মাংস খাওয়া নিমন্ত্রন ”কথাটির তাৎর্পয্য ,এই যে বাবা আমাকে যখন প্রান কর্ম্ম দেন,সেই থেকে নির্দেশ দেন ৬ মাস তুমি নিরামিশ  ভক্ষন করিবে,আলাদা এক ঘরে শয়ন করিবে,এক প্রান কর্ম্ম চালাইয়া যাইবে। ৬ মাস পর বাড়ীতে গিয়া সেখান হইতে স্বামীজি আমাকে নিমগাছী নিয়া আসেন,পথের মধ্যে স্বামীজি আমাকে পূর্বের ন্যায় চলিতে নিদেশ দেন। ক্ষুদিরাম দাকে বলিলাম গুরু যাহা করে সেইটি উত্তম। আমি দাদা কে স্বামীজির কথা খুলিয়া বলিলাম এবং সেই হইতে প্রতিজ্ঞা করিতেছি জীবনে মাছ,মাংস খাব না। ঐ রাতে আমার পেটের অসুখ হয়। পর দিন বাবার নিকটে গিয়া সমস্ত কথা বলিলাম।

দেশ বিভাগের পূর্বে তখন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ চলিতেছিল,স্বামীজি এক বার পাবনা জেলায় সিরাজগঞ্জ মহুকুমার ভাঙ্গাবাড়ী পার্শ্বে, যোগনালা গ্রামে যান। সেখানে আমাদের গুরুভাই শ্রী প্রান গোপাল সরকারের বাড়ীতে তিনি আস্তানা করেন (প্রান গোপাল সরকার বর্তমানে জীবিত বয়স তার ৯৬বৎসর)একদিন সকালে ৮ কিংবা সাড়ে ৮টা দিকে হঠাৎ ভক্ত মন্ডলির মধ্যে দেহ কাপিয়া তুলিলেন এবং বলিয়া উঠিলেন “জাপান শহরটি ধ্বংস হয়ে গেল।” তার কথার উত্তরে প্রাণগোপাল সরকার বলিলেন,আপনি রয়েছেন,পাবনা জেলায়,জাপান শহর রয়েছে কোথায়। আপনি কেমনে বুঝিলেন ধ্বংস হয়ে গেল। স্বামীজি ঈষৎ হাসিতেছিলেন কিন্তু  কথার উত্তর দেন নাই। তারপর দিন প্রাণগোপাল দা বাজার করিবার জন্য উল্লাপাড়া সদরে যান। সেখানে গিয়া খবরের কাগজে দেখেন জাপানে হিরসিমা শহরটি আমেরিকার বোমার আঘাতে ধ্বংস হয়েছে এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু ঘটিয়াছে। একটি খবরের কাগজ কিনিয়া বাড়ী আসিয়া স্বামীজি নিকট আসিলেন। তখন স্বামীজি বলিলেন,আমি গতকাল সকালে দেখিয়াই কথাটি বলিয়াছি। ঐ কাগজ আমার দরকার নাই। ঐ কাগজ শুধু মাত্র তোমাদের জন্য।(পরে আমি ঘটনাটি জানিতে পারি)। দেশ বিভাগের অল্প দিন পর বীলকাজুলি ব্রজলাল তালুকদাররের বাড়ীতে আসেন পুজার ৩দিন পুর্ব্বে,ঐ পুজার কর্ম্মিবৃন্দ স্বামীজিকে বলেন,বাবা আমরা প্রতিমা তৈরী করিয়া,লক্ষী পুজা করিতে চাই,পুজা আপনাকে করিতে হইবে। উনি স্বীকৃতি দেন এবং ঐ গ্রামে মনি পালকে বলেন,তুমি লক্ষèী প্রতীমা তৈরী করিবে। কি কি পুজায় লাগিবে তার একটি তালিকা করে দিয়ে তিনি চলে যান এবং যথাসময়ে পুজার পূর্বে সেখানে হাজির হন। গ্রামের ও পাশ্ববর্তী কর্ম্মদের জানানো হইল এবং উনির নির্দেশ মত সবাই পুজার সময় কর্ম্মে বসে গেল।বহু সময় ধরে পুরোহিত স্বামী “জীবানন্দ”মহারাজ পুজা করিলেন এবং পূজা অন্তে,সবাই স্বামীজি কে জিজ্ঞাসা করিল “কেমন পুজা করিলেন সেটা তো বুঝিতে পারিলাম না। তখন উনি একটা নতুন ব্লেড আনিবার আদেশ দেন এবং উক্ত ব্লেড জলে সিদ্ধ করিয়া মাটির প্রতিমা বৃদ্ধাঙ্গুলীর উপর আচর দিয়ে কেটে দিলেন। আঙ্গুলটি দিয়া তীর বেগে রক্ত বাহির হইতে লাগিল তখন তিনি ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলীর দ্বারা প্রলেপ দিলেন এবং সংগে সংগে রক্ত বন্ধ হইয়া গেল। সবাই অবাক দৃষ্টিতে তাহা অবলোকন করেন । এরপর ঐ বাড়ীতে আরো একটি ঘটনা বিশেষ ভাবে উল্লেখ যোগ্য। স্বামীজি ঐ গ্রামে একটি সামাজিক দরবারে নিজেকে জড়াইয়া ছিলেন এবং ঐ বাড়ী অর্থাৎ ব্রজলাল তালুকদারের মেয়ে সুর্মীলাকে ব্রা‏হ্মন ও অন্যান্য বহিঃ জগতে বিবাহে অনুষ্ঠানিকতা বাদ দিয়া শুধু মালা বদলে বিবাহ দেন। ইহাতে প্রায় ৪৫ গ্রামের অধিকাংশ নমঃসুদ্র সমাজের লোক তাহার উপর ক্ষিপ্র হন এবং তাহাদের চক্রান্তে ব্রজলাল তালুকদারের ভ্রাতুষ্পুত্র পেরিমোহন তালুকদারের স্বামীজির বিরুদ্ধে বগুড়া কোটে মামলা দায়ের করেন। মামলা কারন ছিল ‘‘অন্যত্র হইতে এক সাধু আসিয়া আমাদের সমাজের উপর অত্যাচার শুরু করিয়াছে। তারপর স্বামীজির নামে কোট হইতে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারী করিয়া ধুনট থানার ভারপ্রাপ্ত অফিসার(তদ-কালীন) শ্রী কমলা কিঙ্কর চক্রবর্ত্তী নিকট প্রদান করা হয়। তখন স্বামীজি বিলকাজুলী ব্রজলাল তালুকদারের বাড়ীতে বর্তমান ছিলেন। তাঁহাকে গ্রেফতার করিবার পূর্ব দিনে,তিনি ব্রজলাল তালুকদারকে বলেন,আগামীকল্য তোমার বাড়ীতে কয়েক জন অতিথি আসিবে। তাহাদের আপ্যয়নের জন্য তুমি আগে হইতে কিছু চা ও মিষ্ঠির ব্যবস্থা রাখিবে। স্বামীজির কথা মত ব্রজলাল তালুকদার নিদিষ্ঠ সময়ের জন্য চা মিষ্টির ব্যবস্থা করিয়া রাখিলেন। পরদিন সকাল ৯ টার দিকে স্বামীজি ব্রজগোপাল কে বলিলেন,তোমার বাড়ীতে অতিথিরা আসিতেছে তুমি চায়ের জল গরম করিতে বল এবং খাওয়ার ব্যাবস্থা কর। কিছু সময় অতিবাহিত হবার পর একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটিল। ধুনট থানার পুলিশ অফিসার কমলা চক্রবর্ত্তী ও তাহার সহিত সেকেন্ড অফিসার সহ ছয় জন পুলিশ আসিয়া হাজির হইল। স্বামীজি তখন বাড়ীর বৈঠক খানায় চোকির উপর আসন পাতিয়া বসিয়া আলোচনা করিতেছেন। ঠিক কমলা বাবু তখন তাঁহাকে গ্রেফতার করিবার জন্য বৈঠক খানা ঘরের মধ্যে ঢুকিতেছেন অর্থাৎ এক পা তার ঘরের চৌকাঠের ভিতর ও অন্য পা বাহিরে এমন অবস্থায় স্বামীজি বলিয়া উঠিলেন কি রে কমলা আমাকে গ্রেফতার করিতে আসিয়াছিস? কমলা বাবু বাক্-বিহীন অবস্থায় বেশ কিছু সময় দাঁড়াইয়া থাকিলেন। তখন স্বামীজি  বলেন,কি চিন্তা করিতেছিস কর্ম্ম নিবি? এই কথা বলার পর স্বামীজি ব্রজলাল কে জল আনিবার,যাহা দিয়া কমলা বাবু হাত পা ধুইবে। কথা অনুসারে কাজ হইল।স্বামীজি কমলা বাবুকে এরপর বলিলেন “তোর চোরধরা পোশাক” (পুলিশী পোশাক) খোল,ধূতী পর।কমলা বাবু তাহাই করিলেন। স্বামীজি কমলা বাবুকে কর্ম্ম দিলেন। কমলা বাবু তারপর বলিলেন “বাবা আপনার বিরুদ্ধে গ্রেফতারী  পরোয়ানা আসিয়াছে অতএব আপনি কিছু দিন বাহিরে থাকুন,আমি রির্পোট দেয় তাহাকে পাওয়া গেল না। তখন স্বামীজি বলিলেন “আমি ধুনটে নিখিলের বাড়ী,না হয় যজ্ঞেশ্বরের বাড়ীতে থাকিব”। তার উত্তরে কমলা বাবু বলিলেন “সে স্থানটি তো আমার থানার অতি নিকটে হয়ে গেল। তদ্ উত্তরে স্বামীজি বলিলেন,“তুমি আমাকে তাহলে গ্রেফতার করে বগুড়া পাঠিয়ে দাও, আমি এক দিন বগুড়া জেলাকে ঠিক করব”। সেই সময় কমলা বাবু নিঃ উত্তর ছিলেন। এরপর তাদের বিদায় দেওয়ার আগে আদর অভ্যার্থনা করে,যাওয়ার সময় স্বামীজি বললেন,তোমরা গিয়ে,যজ্ঞেশ্বর বাবু কে বলিবে,“আমি তার ওখানে বিকালে যাইব”। উনিরা সবাই সাইকেল করে তিন মাইল দুরে থানায় ফিরে আসিলেন এবং দুই জন পুলিশদের কমলা বাবু হুকুম  দিলেন, যজ্ঞেশ্বর বাবুকে সংবাদ দিতে। পুলিশদ্বয় কথা অনুসারে থানার পার্শ্বে অবস্থিত বাবু যজ্ঞেশ্বর সাহার বাড়ীতে উপস্থিত হয়ে,তারা খবর দিতে উদ্যত হইলেন। কিন্তু গিয়া দেখিলেন যজ্ঞেশ্বর সাহা এবং স্বামীজি দুই জনে বৈঠক খানায় বসিয়া আলোচনা করিতেছেন। উহা দেখিয়া পুলিশ দ্বয় অবাক হইলেন কারন তাহারা স্বামীজিকে থানা হইতে তিন মাইল দুরে বিলকাজুলী গ্রামে রাখিয়া আসিয়াছেন এবং তারা সবাই সাইকেল করে থানায় আসিয়া সংগে সংগে সংবাদ দিতে আসিয়াছেন। এক জন সাধারন মানুষ হাঁটিয়া কিছুতেই এত গুলি পথ এত তাড়াতারি অতিক্রম করিতে পারিবে না! তারপর এক দিন ব্রজলাল তালুকদারের বাড়ীতেই স্বামীজি হুকুম করিলেন কয়েকটি সামিয়ানা উঠাতে যাহাতে একটি সভার আয়োজন করা যায়। কথা বা হুকুম অনুসারে কাজ করা হইল কিন্তু কোন ব্যাক্তি সভায় আসিবার জন্য আহ্বান করা হইল না। ঘটিল অদ্ভুত ঘটনা। বিকালে ২টার পর চারিদিক হইতে হিন্দু মুসলমান ক্রমাগত তালুকদার বাড়ীতে হাজির হইতে শুরু হইল। সভার কাজও যথারীতি শুরু হইল। প্রারম্ভে আমাকে স্বামীজি একটি কাগজ দেন সভায় পড়িবার জন্য,কাগজে কি উল্লেখ ছিল তা বর্তমানে আমার মনে নাই। আমার পাঠ অন্তে স্বামীজি নিজে সমালোচনা শুরু করেন। উপস্থিত জনসাধারন মন্ত্র মুগ্ধ হরিনের ন্যায় আলোচনা শ্রবন করেন। এরপর যথা সময়ে সভার  কাজ শেষ করেন এবং যার যার মত সবাই বাড়ী ফিরে যান।

এক তারিখে বাবা আমাদের বাড়ীতে আসেন এবং আমাকে সংগে লইয়া  রাত্রিতে ধুনটে শ্মশানে বট বৃক্ষের নিচে আমরা উভয়ে কর্ম্ম যোগ করি। তখন ভাদ্রমাস বর্ষার জল নামিয়া যাইবার সময়। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন ও পূর্ব দিকে বায়ু প্রবাহ হইতেছে। রাত্রি অনুমান ১টার মত হইবে। এমন সময় একটি দুঃগন্ধ নাকে আসিয়া পড়িল। তখন স্বামীজি বলিলেন,নিখিল দেখতো কি ভেসে আসছে।তখন আমি উঠিয়া নদীর তীরবর্ত্তী হয়ে দেখিলাম কি যেন কাল ভেসে আসছে। আরো কিছু সময় লক্ষ্য করি,দেখিলাম একটি স্ত্রীলোকের মৃত দেহ ভাসিয়া আসিতেছে। বিষয়টি আমি বাবাকে বলিলাম তিনি মৃত দেহ ধরিতে আদেশ দিলেন। আমি সংগে সংগে জলে নামিয়া বাম হাতে মৃত ব্যাক্তির চুল ধরিয়া টানিয়া তুলিলাম। তখন আবার উনি মৃত দেহকে ছাড়িয়া দিতে আদেশ দিলেন এবং বলিলেন হাত ভাল ভাবে ধুয়ে তোমার আসনে বস। আমি কথা অনুসারে কাজ করিলাম। তখন উনি বলিলেন“তোর স্ত্রী যখন মারা যায় তবে তার ঐ রূপ অবস্থা হইতে পারে কি? “কিংবা আমি যদি মারা যাই তবে আমার দেহটা ঐ রূপ অবস্থা হবে ? আমি উত্তর দিলাম “সবারই হবে”তিনি বলিলেন এই হিসাব করে সংসারে চলাফেরা করিবে এবং স্ত্রী জাতীর সংগে কথা বলিতে গেলে প্রথমে পদ বন্ধনা করিবে এবং তারপর তার সংগে কথা কহিবে।

আর এক তারিখে সে দিন স্বামীজি ও নন্দমাতা ছিলেন। পাবনা জেলা ফরিদপুর গ্রামে পার্ব্বতী সাহার বাড়ীতে সেই দিন গিয়াছিলাম। রাত্রিতে শয়ন করিলাম আমার স্থান মাঝখানে,আমার ডান দিকে স্বামীজি আর বাম দিকে নন্দমাতা। দুই পার্শ্বে দুই জন শয়ন করিয়াছেন কিন্তু স্বাস প্রস্বাসের গতাগত কিছুই বুঝা না। তখন আমি পরীক্ষা করিবার জন্য (যে সে ঘুমাইতেছে কিনা) বাম হাতে তর্জ্জনী আঙ্গুল স্বামীজির নাসিকার কাছে ধরিলাম । তখন তিনি উত্তর করিলেন “কি দেখিতেছ নিখিল আমি ঘুমাই না ? সংগে সংগে আমি হাত সরাইয়া নিলাম। স্বামীজি তখন বলিলেন দিবা রাত্রি কোন সময় আমাদের ঘুমানো বা আহার করিবার প্রয়োজন হয় না,তবে বহিঃ জগতে লোক সমাজে চলিতে গেলে কিছু আহার করিতে হয়। তাহা না করিলে মানুষের নিকট ধরা পরিতে হইবে। তার কিছু পরে নন্দমার স্বাস প্রস্বাস দেখিবার জন্য ডান হাতের আঙ্গল মায়ের নাসিকার নিকট ধরিলাম। স্বামীজি ন্যায় তিনিও একই উক্তি করিলেন। তারপর নন্দমার বাম হাত খানা আমার বুকের উপর স্থাপন করে বলিলেন তুমি ঘুমাইয়া পর। আমি ঘুমাইয়া পড়িলাম।

অনুমান ১৩৫৭ সাল আমি এক বার কলিকাতা যাই। সেখান হইতে আমি মুরশিদাবাদ জেলা জিয়োগঞ্জ বড় নগর  আমার অগ্রজ পিসাতো ভাই যোগেন দাসের বাড়ী যাই।(এখানে উল্লেখ করা যায় আমার পিসাতো  ভাই যোগেন্দ্র নাথ দাস পাবনা জেলায় ফরিদপুর গ্রামে বাড়ী বিক্রয় করিয়া বড় নগর গিয়া বাড়ী করেন) সেখানে যাওয়ার পূর্ব যে কোন প্রকারে আমি জানিতে পারি,স্বামীজি বড় নগর হইতে দক্ষিন পশ্চিমে ১০/১১ মাইল দুরে (আমার অচেনা) গোকর্ন শ্মশানে আছেন। আমি আমার পিসাতো ভাইকে একটি সাইকেল ভাড়া করে দিতে বলি,যে কারন জিজ্ঞাসা করিলে আমি,স্বামীজি গোকর্ন শ্মাশানে অবস্থানের কথা বলি। তিনি সংগে সংগে বলিলেন “আমি এইকথা শুনিয়াই গোকর্ন শ্মাশানে গিয়াছিলাম কিন্তু সেখানে স্বামীজি নাই,অন্য এক সাধু এবং সংগে তার এক মেয়ে মানুষ দেখিলাম। সাধু অবশ্যই আমাকে বসিতে বলিয়াছিল কিন্তু সে আমার গুরু নয়,বলে তার ওখানে বসি নাই। যোগেন দার কথায় আমার আস্থা না আসতে,আমি সাইকেল ভাড়া করে গোকর্ন শ্মশানে পথ পরিচয় নিয়ে রওনা দেই। পথে নানা লোককে জিজ্ঞাসা করে শেষ পর্যন্ত গোকর্ন শ্মাশানে পৌছি। গিয়া দেখি স্বামীজি ও নন্দমাতা বসে আছেন। স্বামীজি আমাকে দেখিয়া ঈশৎ হাসিয়া বলিলেন, তুমি কোথা হইতে আসিলে। নোয়াখালি হইতে যে পত্র খানা তোমাকে দিয়াছি,সেটি তুমি পাইয়াছিলে। আমি উত্তর দিলাম পাইয়াছি। এরপর স্বামীজি বলিলেন,সেদিন যোগেন আসিয়া ছিল,আমি বসিতে বলিলাম কিন্তু সে না বসে চলে গেল। নন্দমাতা সংগে সংগে বলিলেন,স্বামীজিকে উল্লেখ করিয়া বলিলেন“তুই আবার অন্য রূপ ধরলি কেন? যোগেন তোকে চিনতে না পেরেই তো চলে গেল। নন্দমাতার কথাটি আমি মনের মধ্যে গাঁথিয়া রাখিয়াছি। এর পর স্বামীজি আমাকে বসিতে বলিলেন এবং তাঁর সঙ্গে নানা বিষয় আলোচনা হইল।

তারপর আর একটি ঘটনা কথা উল্লেখ করি,বৈশাখ মাসে স্বামীজি ভক্তদের নিয়ে কোন এক স্বানে যাইতেছে পথে রাত্রি হইয়া গেল। পশ্চিম আকাশে ভীষন ঝড়ে মেঘ দেখা দিল। সবাই তো গ্রামে এক বিরাট মাঠের মধ্যে দিয়া চলিতেছে। উনি তখন ভক্তদের আশ্বাস দিয়া বলিলেন একটু এগিয়ে চল, সামনে একটি দালান ঘর দেখা গেল,স্বামীজি তাহাতে উঠিতে বলিলেন অন্য কোন লোক জন ছিল না। দালানে উঠিয়া সবাই কর্ম্মযোগ সারিয়া শয়ন করিল। রাত্রিতে ভীষন জড় সহ বৃষ্টি হয়ে গেল। পর দিন ভোরে স্বামীজি সবাই কে ডাকিলে,ওঠ কর্ম্ম যোগ করিতে হইবে। ঘুম থেকে উঠে সবাই দেখে তারা রাত্রিতে একটি শ্মশানে ধানের জমির মধ্যে শুয়ে ছিল। এখন যে ঘটনার উল্লেখ করিব তাহা পূর্ব্বে আলোচনা করা উচিত ছিল কিন্তু ভুলক্রমে তাহা পরে আলোচিত হইল। ধুনট অধিবাসী বৃন্দাবন চন্দ্র সাহার এক মাত্র পুত্র যজ্ঞেশ্বর সাহা সম্বন্ধে এবারের আলোচনা। ইনি জমিদার,জোতদার,বৃত্তশালী লোক ছিলেন। ইনি কোন এক সময়ে রাজ যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হন। বহু চিকিৎসা করে ভাল না হয়ে শেষ চিকিৎসার জন্য কলিকাতা যাদবপুর টি,বি হাসপাতালে ভর্ত্তি হন। তিনির ফুসফুসের যে ২টি স্তর আছে তার ১টি স্তর সর্ম্পূণ নষ্ট ও অন্যটি ১০ আনা অংশ নষ্ট হয়ে যায়। ডাক্তারা অসুখ না ভাল হওয়ার কথা বলে দেন। দিন নিদিষ্ট করে দেন,এতদিন পর আপনার মৃত্যু সুতরাং কিছু ঔষধ দিচ্ছি বাড়ী গিয়ে বসে বসে খাবেন আর ঈশ্বরের চিন্তা করিবেন। দেহ টাকে হাসপাতালে রাখবেন কেন? উনি বাড়ী ফিরে মৃত্যুর দিন গুনিতেছিলেন। মনে করুন,কাহাকেও যদি বলা যায় সঠিক ভাবে,আপনার মৃত্যুর অমুক দিন হবে,তা হলে সেই লোকটির মনের অবস্থা কেমন হবে। হঠাৎ যজ্ঞেশ্বর বাবুর বড় জেঠা মহাশয় গোসাই দাস সাহা,তিনি বৈদিক যুগের মহৎ ব্যাক্তি ছিলেন,তিনির শিক্ষার গুরুর বাড়ী,বৃন্দাবন,এক জন নাম করা পন্ডিত, তিনি তৎকালিন আগমন করেন। যজ্ঞেশ্বর বাবুর বাড়ীর দেওয়ানজি সুরেন্দ্র নাথ গুন মহাশয়কে পাঠাইলেন। ঐ গুরুদেবকে আনার জন্য,তিনি শিক্ষা গ্রহন করিবেন। দীক্ষা পূর্ব্বেই গ্রহন করিয়াছিলেন। ঘটনা চক্রে বৃন্দাবনের গোসাই তার পূর্ব্ব দিনে চলে গেছেন। এমন সময় ধুনট কুঠিবাড়ী  নিবাসী কোকন সাহা। যাহার দুই ছেলে রমনী সাহা ও অনিল সাহা। কোকন সাহা নামক এক ব্যাক্তি যজ্ঞেশ্বর বাবুর বাড়ীতে তার নিকটে আসেন এবং বলেন বাবু বুটের ডাল আছে? তিনি বলেন ডাল কি করবে? আমার আচার্য শুদ্ধানন্দ তিনির দাদা গুরু পরমহংস “জীবানন্দ” মহারাজ ও নন্দমাতা এবং আরও ৪/৫ জন গুরু ভাই সঙ্গে আসিয়াছেন। তখন ধুনট কোন বাজার বা দোকান ছিল না। তখন যজ্ঞেশ্বর বাবু বলেন,বাড়ীর ভিতর মার কাছে বল,বোধ হয় আছে। যা লাগবে নিয়ে যাও। কোকন সাহা বাড়ীর মধ্যে চলে গেল। তারপর যজ্ঞেশ্বর বাবু কোকন সাহার বাড়ী চলে যান। নিকটেই বাড়ী কিন্তু ডাক্তারের আদেশ ছিল একা চলাফেরা করা নিষেধ। দুই জন ধরে যাতায়াত করার বিধান ছিল। কোকন সাহা ডাল নিয়ে বাহিরে এসে দেখেন বাবু নাই। ডাকাডাকি আরম্ভ করে,বাড়ীর ভিতর হতে তার মা ও স্ত্রী আরও সকলে খোঁজা খুঁজি,কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। কোকন সাহা বাড়ী গিয়া দেখেন বাবু তার বাড়ীতে স্বামিজির নিকট বসে আছে। তখন বাড়ীতে সংবাদ পাঠান। তার মা,স্ত্রী ও এক মাত্র ছেলে বিনয় সাহা (তখন ছেলে খুব ছোট) ওখানে  গিয়ে হাজির হন। স্বামীজি তখন জিজ্ঞাসা করেন কান্নাকাটি করেন কেন? তখন যজ্ঞেশ্বর বাবুর মা স্বামীজিকে তার ছেলের অসুখ সম্বন্ধে বলেন। তখন স্বামীজি বলেন “ তোর ছেলের কিছু হবে না,তোর ছেলে যদি মরে তবে ঐ রকম একটি যজ্ঞেশ্বর তোমাকে দিয়ে যাব।” যাও যজ্ঞেশ্বর বৈকালে তোমাদের বাড়ী যাব। বৈকালে যজ্ঞেশ্বর বাবুর বাড়ী সবাই এলেন। পর দিন সকালে স্বামীজী হুকুম দিলেন“যজ্ঞেশ্বর”ইদারা (কুয়া) হতে জল উঠাও,স্নান কর,তারপর আমার নিকটে আইস। তখন তার মা কান্না আরম্ভ করেন এবং স্বামীজি কে স্নান করা ডাক্তারের নিষেধ। স্নান করার সংগে সংগে মারা যাবে। স্বামীজী বলিলেন তোমার ছেলে মরিবে না। তখন যজ্ঞেশ্বর সাহা নিজে জল উঠাইয়া স্নান করে কাপড় বদলাইয়া স্বামীজীর নিকটে আসিলেন। তখন স্বামীজি তাকে কর্ম্ম দিলেন এবং তুমি সাইকেল চড়,ঘোড়ায় চড়,তোমার মৃত্যুর জন্য আমি দায়ী,আমি দেড় মাস তোমার এখানে অবস্থান করিব। তারপর সকলকে বিদায় দিয়া স্বামীজি ও নন্দমা সেই বাড়ীতে দেড় মাস অবস্থান করেন এবং সামান্য একটু ক্ষত রহিয়াছে,চল কার্সিয়ান যাইতে হইবে। সেখানে ৯০ দিন থাকিতে হইবে বৌমাকে সংগে নাও। যজ্ঞেশ্বর বাবু তার স্ত্রী শ্রীমতি প্রিয় বালা সাহা ও ছেলে বিনয় ভূষন সাহা এই ৫ জন কার্সিয়ান ৯০ দিন অবস্থান করার পর স্বামীজি বলেন তুমি এখন সর্ম্পূন সুস্থ বাড়ী ফিরে যাও। ধুনটে গিয়া বল যে,আমি ১বৎসর পর তার(নিখিল গোবিন্দ) সংগে দেখা করিব। ফিরে এসে তারা(যজ্ঞেশ্বর সাহা) আমাকে ঐ কথা বলে। ১বৎসর পর স্বামীজি ও নন্দমা ধুনটে আমার ওখানে আসিলেন। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম এত দিন কোথায় ছিলেন? উনি কোন উত্তর দিলেন না। মা বলেন,ওর সমস্ত শরীর লাউ ফুলের মত সাদা হয়ে যায়। ১ বৎসর পর্ব্বত গুহার মধ্যে অবস্থান করে শরীর ঠিক করে চলে আসে। সেই যজ্ঞেশ্বর বাবু বিনা ঔষধে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেয়ে গেল। যজ্ঞেশ্বর সাহা মহাশয়ের জম্ম হয় ১৩০২ সনের ৮ই চৈত্র শনিবার বৈকাল ৪ ঘটিকার সময়। ঠিক ৯০ বছর বয়সে ১৩৯২ সনের ৮ চৈত্র ৪ ঘটিকার সময় দেহত্যগ করেন। যোগ কর্ম্ম গ্রহন করার পর ৪২ বছর বেশী জীবিত ছিলেন। স্বামীজি দেহ ত্যাগ করার পর হতে প্রতি বৎসর জীবানন্দ তিরোধান উৎসবে যাহা ব্যায় হইত বা হয় তাহার ১৪ আনা খরচ ব্যায় করিতেন বা বর্তমানে তাহার ছেলে বিনয় ভূষন সাহা করিতেছেন। সারা বৎসর কর্ম্মিদের যাতায়াত ব্যয় তিনি করিতেন। এরপর আর একটি ঘটনায় স্বামীজি আমাদের গ্রামে দাস পাড়া ৮ টা ছেলেকে কর্ম্ম দেন একই দিনে। ঐ দিন রাতে বীর বল্লভ দাসের বাড়ী অবস্থান করেন। ঐ রাতে আলোচনা করিতেছেন হঠাৎ এক ব্যাক্তি স্বামীজি কে প্রশ্ন করেন আপনি মাছ,মাংস খান না,মাছ তো জলে বাস করে, মাছ খাওয়া বাঁকী কোথায় ? মাংস খান না ? গরুর দুধ খান ? গরুর দুধ খাওয়া যে কথা,গরুর রক্ত খাওয়া সেই কথা ? এই কথা বলার  সংগে সংগে অগ্নির ভিতর ঘৃত প্রক্ষেপ দিলে য়ে রূপ অবস্থা সেই রূপ প্রজ্জলিত হয়ে উঠলেন বাবা। তিনি হুঙ্কারে ঘরের চাল ঝন ঝন করে উঠল,গোমুখী আসনে বসে ছিলেন,মা ছিলেন বীরাসনে। মা তখন বুক চাপরায়(নিজের) আর স্বামীজি উদ্দেশ্যে বলেন,তোকে পূর্ব্বেই বলে ছিলাম,কচু বনে মুক্তা ছিটাবি না। তুই আমার কথা শুনলি না। ওঠ এখান হতে চল,নিখিলের বাড়ী,এ জাতি জাগবে না। তখন স্বামীজি খুব গম্ভীর স্বরে বলেন,নিখিল আমাকে চেনে আর তোমরা চেনলে না ? আজ ১২ যুগ প্রচার করিলাম এর মধ্যে এমন বাক্য শুনি নাই। আজ তোমাদের এখানে এসে নতুন বাক্য শুনিলাম। তখন তিনি গায়ের গেঞ্জীর মত জামা উঠাইয়া দেখান,নিখিল দেখ,কত জনের মার আমার পিঠে আর,এই হাতে কত সহস্র সহস্র লোক প্রাণ দিয়েছে,তবুও এ হাত বিচলিত হয় নাই। তা তুমি জান।তখন যে আমার অবস্থা কি তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। এরপর স্বামীজিকে বলিলাম বাবা প্রচারে অনেক বিঘœ আপনাকে সহ্য করিতেই হইবে। জলের রেখার মত রাগ যে কোথায় মিলিয়া গেল হাসিতে হাসিতে বলিলেন ঠিক বলেছ,প্রচারে অনেক বিঘœ। বাড়ীর মালিক বাবার পায়ের উপর পরে। যে ভদ্রলোক প্রশ্নটি করে সে বহি:জগতের গোসাই এবং আমাদের সংঘের বিরোধী লোক। পূর্ব্বে যখন ডাইরী লিখি নাই,কাজেই বহু বৎসরের ইতিহাস আমার লেখা খুব কঠিন হয়েছে। এখানে অন্য অধ্যায় কিছু আলোকপাত করি। দেশ বিভাগ ও আগষ্ট মাসে আন্দোলনের পূর্বে বৎসর বাবা আমাকে বলেন“বাবা দেশের অবস্থা অন্যরূপ ধারন করবে”দেশটাকে ভাগ করে দিতে হবে,তবুও তোমাকে এ দেশে বাস করতে হইবে। আগষ্ট মাসে আন্দোলনে সময় উনি নোয়াখালি ছিলেন এবং সেখান হইতে তিনি আমাকে পত্র দেন। তারপর দেশ বিভাগ হল,বহু লোক এ দেশ থেকে চলে গেলেন,যখন পাসপোর্ট হল,তখন আমি বাবা কে বললাম,আপনার একটি পাসপোর্ট করিতে হইবে। তদ্ উত্তরে বলিলেন পাসপোর্ট দিয়ে কি হবে? ও ধারে আপনার যথেষ্ট ভক্ত আছে যাতায়াত তো করিতে হইবে। তখন তিনি বলেন ব্রহ্ম দেশ হইতে বোম্বাই পর্য্যন্ত এক রাত্রে স্থল পথে যাতাযাত করা যায়। আর এক পন্থা আছে এক রাতে বিশ্বটা পরিভ্রমন করা যায়। আমি তো শুনেই অবাক। পুনরায় জিজ্ঞাসা করার মত কিছুই নাই।(বাক্য নাই,সমস্ত হারিয়ে যায়,আর বলতে পারি না)আমার পূর্ব্বতম কর্ম্মি নবাবগঞ্জ অধিবাসী ললিত ক্ষেপা,ধনঞ্জয়,সুরেন ক্ষেপা,দুর্ল্যভ ক্ষেপা.পাবনা জেলায়,শুদ্ধানন্দ,ত্রৈলক্য,শরৎ,সূর্য্যপন্ডিত(সুনীল, শ্যামলের বাবা)ইত্যাদি আরো অনেক। ইনিরা আমাকে যথেষ্ঠ উপদেশ দিয়াছেন। তাদের উপদেশ,স্বামীজি সম্বন্ধে বর্ননা বহু শুনিয়াছি,তারা কেহই ইহ জগতে নাই। সে সব লেখার মত ক্ষমতা আমার নাই। তবে এখন স্বামীজি(জীবানন্দ) দেহ ত্যাগের কিছু পূর্ব্ব ঘটনা হইতে আমার লেখনির ইতি টানিব। ১৩৫৯ সনের চৈত্র মাসে ২৮ তারিখে,ধুনট থানার অধিন ভাংগার ছেও নিবাসী রামলাল মিস্ত্রি নামক এক ব্যাক্তি প্রায় বেলা ১টা হবে,চৈত্র মাস পশ্চিমা বাতাস ঝড়ের মত প্রবাহিত,তিনি আসিলেন আমার নিকট,তিনি বলিলেন বাবার অসুখ,আপনাকে এখন যাইতে হবে,বানিয়াজান গ্রাম নিবাসী শ্রী বিজয় মন্ডলের বাড়ী। তখন আমি বলিলাম আপনার বাবার অসুখ আমাকে ডাকবেন কেন ? তদ্ উত্তরে রাগ করে তিনি বললেন আমার বাবা যে,আপনার বাবাও সেই।আমি বুঝিলাল স্বামীজির অসুখ,আমাকে ডেকে পাঠাইয়াছেন।তদ্ উত্তরে আমি বলিলাম বাবার আবার অসুখ কি ? আপনি ভুল বলিতেছেন। তখন উনি রাগান্বিত ভাবে বলিলেন,বেশি কথা না বলে চলুন। আমি যাবার রাস্তার বিবরন শুনে নিলাম,ধুনট হতে ৭/৮মাইল দুরত্ব। আমি বিজয় মন্ডলের বাড়ী সাইকেল যোগে উপস্থিত হইলাম, যেয়ে দেখি দক্ষিন দুয়ারী টিনের ঘরের মধ্যে রোদ খাঁ খাঁ করিতেছে,বাবা মেঝেতে খরম পায়ে দাঁড়াইয়া,মা শুয়ে আছেন। বাবাকে বলিলাম বাবা আপনার আবার অসুখ কি? নাড়ী ধরে দেখি বাবার ডবল নিউমোনিয়া,মার হাতের নাড়ী দেখিলাম তিনিও ডবল নিউমোনিয়া,দুই জনে একই ব্যাধি আমি হতভম্ভ হয়ে চিন্তা করিলাম,এখন আমার কি করা দরকার। বাবা বলিলেন “নিখিল তুমি আমাকে নিয়ে চল ওখানে আমি হেটে যেতে পারব কিন্তু মা পারবেন না। আমি বলিলাম ২ খানা পাল্কী নিয়ে আসি। নিষেধ করিলেন বলিলেন দেখ মহিষের গাড়ী পাওয়া যায় কি না? বাড়ীর কর্ত্তা বিজয় মন্ডলকে গাড়ীর সন্ধানে পাঠাইলাম,অনেক খুঁজে মহিষের গাড়ী না পেয়ে,গরুর গাড়ী নিয়ে আসিল। সন্ধ্যার পূর্বে আমাকে বিদায় দিলেন।বলে দিলেন গুর্জ্জিয়া তরনীকে এখানে পাঠাবে আমার নিকট। ওখান হতে রওনা দিলাম,কিছু দুর আসার পর সূর্য্য অস্ত গেল।অন্ধকার ঘনায়ে এল,সেই সময় রাস্তায় আমাদের বাড়ীর নিকট বর্ত্তী তরনী দার সহিত দেখা হইল। তাহাকে বাবা ও মায়ের অসুখের কথা বলিলাম তিনি সেই রাত্রীতে বানিয়াজান রওনা হয়ে গেল। পর দিন ১০টা দিকে তরুনী দাদা,বাবা ও মা আমার পর্ণ কুটিরে এসে উপস্থিত হলেন। আমি মাকে গাড়ী হতে ধরে নামাইলাম। ঘরে এসে বাবা কে বললাম আমি আপনাদের খাবার কি ব্যাবস্থা করিব,ডাব এনে রেখেছি,২টি ডাব কেটে দিলাম। তিনি উত্তর দিলেন তুমি যাহা দিবে তাহাই খাইব। তখন আমি কথার স্থলে বলেছিলাম বাবা,ভাত যদি দেয় তাই খাবেন,তিনি বলেন খাব। আপনার যে অসুখ ভাত খেলে বাচিবেন না। তদ্ উত্তরে বলেন ২বোতল নাইট্রিক এসিড খেয়ে যদি না মরে থাকি তবে ভাত খাইলে মানুষ মরে,তুমি বল কি? আমি শুনিয়াই অবাক। তখন তিনি ব্যাগের হতে রবিনসন বার্লী ১কৌটা বাহির করিল। বার্লী জাল দিলেন আমার শ্বাশুড়ী। ডাক্তার ডাকিয়া আনিলেন,তিনি ঔষধ খাবেন না,অনেক অনুরোধ করে ঔষধ দেওয়া হল ৪/৫ এক বারে খেয়ে ফেললেন। মা তো খাইলেন শেষে অনেক অনুরোধের পর মা বললেন,তুমি যখন ছাড়বে না,এখন হোমিওপ্যাথ ডাক্তার ডাক। ডাক্তার আমাদের গ্রামেই আছে। তিনি ঔষধের ব্যবস্থা করে দিলেন কিন্তু ঐ একই রূপ ৪/৫ দাগ ঔষধ এক বারে খেয়ে নেন। এই ভাবে সময় চলিল ২৯/৩০তারিখ অতিবাহিত হল,ডাক্তার বলিল দুইজনে এক জনও টিকিবে না। ভাল তিন জন ডাক্তারও ঐ একই কথা বলিলেন। আমি ও তো আয়ুর্ব্বেদ কবিরাজ সবাই তো বুঝি তবুও আমার রোগী,বুঝেও বুঝি না,এরকম অবস্থা আমার,রাত্রী দিনে আমার অনাহার,নাই ঘুম নাই,শুধু চিন্তা এ কি হল? কোথায় বাড়ী কোথায় ঘর অজানা পরিব্রাজক সাধু,আমাদের আচার্য্য,আমার হাতে টাকা নাই এমন কি গাড়ী ভাড়া ৪ টাকা আমি দিতে পারি নাই তাহাও স্বামীজি নিজে দিয়াছেন। আমি চিন্তা করে রাখিলাম ভাল হলে যাবার দিনে ঐ টাকা দিয়ে দেব। কালচক্রে আমার আর দেওয়া হয় নাই। তৎপর লিখি ঐ সময়ে যজ্ঞেশ্বর বাবু শিলিগুড়ী গিয়াছিলেন,৩০শে তারিখ রাত্রিতে বাবা আপন মনে বলিতে লাগিলেন, যজ্ঞেশ্বর শিলিগুরী হইতে বগুড়া আসিয়া,ওর মহাজনের সহিত হিসাব করিতেছেন সারা বৎসরের। ওর জন্য আর কত অপেক্ষা করব। আমি জিজ্ঞাসা করি বাবা কি বলেন ,তিনি কোন উত্তর দিলেন না। মা তো কিছুই বলেন না। বসে থাকেন আর শুয়ে থাকেন। পায়খানা নাই,প্রসাব নাই,কোন উপদ্রব নাই,গ্রাম বাসী কেহই ভয়ে কাছে আসে না। আমার বাল্যবন্ধু অনাথবন্ধু সরকার, তরনী দা আসেন রাত্রে থাকেন আবার থাকেন না। বিলকাজুলী নিবাসী স্বামীজি এক ছাত্রী সরমা দেবী,উনি সব সময় কাছে ছিলেন,উনি বাড়ীতে যান নাই। পরবর্ত্তী গ্রামের কর্ম্মীদের সংবাদ দেওয়া হল কিন্তু তারা কোন সারা দিলেন না। আমিও কাহাকে ভাল জানি না,কে কর্ম্ম করে,কে করে না? ১৩৬০ সনের ১লা বাংলা তাং মঙ্গলবার রাত্রিতে বাবা বলিলেন,তোমার নিকট ২নং ২খানা খাতা আছে আন এবং লাল কালির দোয়াত আন। আমি আনিলাম। তখন তিনি বলা শুরু করিলেন আর আমি লেখা শুরু করিলাম। ১নং খাতা শেষ হল লিখতে লিখতে। তারপর ২নং খাতা শুরু করিলাম। রাত্রী প্রায় শেষের দিকে আমি বলিলাম,বাবা আপনার কষ্ট হচ্ছে পরে লিখিব। তিনি বলিলেন পরে আর হবে না। সে খাতা ও শেষ হল তিনি বলিলেন তোমার কাহার ও নিকট যাইতে হইবে না। সবই রহিল,নিকটে এলে প্রত্যাক্ষান করিবে না,উপযাজক হয়ে কোথাও যেও না। আমি কিছুই বুঝিলাম না। যাক রাত্রি প্রভাত হল। পরদিন বুধবার আমার চির স্মরনীয় দিন আমি সর্ব্বদা উনিদের(বাবা মা)নিকটে অবস্থান করি। আর মাথায় জল ঢালি। বেলা প্রায় অনুমান দেড়টা হবে,বাবা বলিলেন নিখিল আমাকে কোলে নাও তো,আমি অবাক অতবড় মানুষকে কে কোলে নিব কি করে? আমি জোর আসন করে বসিলাম বাবা আমার কোলের উপর বসিলেন,আমার যেন খুব ভার বেধ হল না। আমি দুই হাত দিয়া তিনির দেহ জড়াইয়া ধরিলাম। কিছু সময় অতিবাহিত হওয়ার পর আমাকে বলেন “নিখিল”আমাকে সোয়াইয়া রাখ। ঘরের মধ্যে দুই খানা চকি একত্রে ছিল,চকির ধারে পূর্ব্ব শিয়রি করে শোয়াইলাম,অনেক ক্ষন অতিবাহিত হইবার পর বললেন,নিখিল আমার বুকের উপর হাত রাখ এবং বলিলেন আপন মনে “পাকিস্তান নামে হয়েছে কাজে হয় নাই। তোমরা প্রত্যেক ছেলে পাকিস্তান(পাক স্থান বা পবিত্র স্থান) যাহাতে কার্য্যে পরিনত হয় চেষ্টা করো” এটি আমার সাথে তাঁর শেষ কথা” আমি টুল পারিয়া চকির ধারে বসিলাম ও বুকের উপর হাত রাখিলাম। মা চকির মধ্যস্থানে আসন পেতে পদ্মা আসনে বসে ছিলেন। তারপর সমস্ত ঘর নীল আভা বিদ্যুৎতের মত আলোকিত হয়ে উঠল। তারপর দেখি সব শেষ। ডাক্তার আসিলেন ও অন্যান্য অনেক লোকে বাড়ী লোকারন্য হয়ে গেল। সবাই বলে শেষ,বাহিরে বাহির কর দেহ। মা বললেন না,বাহির করা হবে না। এই অবস্থায় থাকবে। মানুষ ধীরে ধীরে চলে গেল। বিভিন্ন লোক বহু রকম কথা অবতারনা করিল,মরা নিয়ে নিখিল দত্ত বসে থাকুন। হিন্দুরা স্নান করে বাড়ী চলে গেল। মুসলমান  কমপক্ষে ২শত কম নহে সবাই চলে গেল। আমি হতবম্ব হয়ে বসে,বাকরহিত অবস্থায় বসে আছি। ধীরে ধীরে সন্ধ্যা ঘনাইয়া এল। মানুষের ভৎসনা কথা আসা শুরু হল। ঘরের মধ্য তরনী দা,অনাথ বন্ধু,আমি,বিধবা সরমা দেবী আর নন্দমাতা আসনে বসে আছেন। নিরব নিঃস্তদ্ধ রজনী ক্রমশ গভীর হয়ে এল তখন তরনী দা মেঝেতে শপ(পাটি) পেতে শয়ন করিলেন এবং ঘুমাইয়া গেলেন,অনাথ বন্ধু বাবার পায়ের নিকট ও আমি মাথার কাছে টুলের উপর বসে,মা সব দেহ সম্মুখে নিয়ে আসনে সমাসিন। রাত্রি অনুমান ১টা পর হতে মা বলে । নিখিল শুয়ে পড়। অনাথ শুয়ে পড়। আমি বাকরহিত অবস্থা বসে আছি। কিছুক্ষন পর আবার বলিলেন শুয়ে পড় না কেন? তখন আমার এমন অবস্থায় ঘুম আসিবে না। পুনরায় মা শোয়ার কথা বলিলেন,তখন আমি বাবার মাথার নিকট দিয়া,দক্ষিন দিকে মাথা দিয়া আর অনাথ বন্ধু পায়ের নিকট দিয়া শুইলাম। তারপর মা তাঁর আসন হইতে শুন্যে তিন পোয়া হাত পরিমানে উঠিলেন,বার বার যখন আমাকে শোবার কথা বলেন তখন আমার সন্দেহ হয়। তখন আমি বাবার বুকের উপর হাত দিলাম,দেখি বুক গরম,অমনি ডান হাতের নাড়ী পরীক্ষা করে দেখি,নাড়ী ঠিক মত চলিতেছে,তখন মনের আশার সঞ্চার হল। তখন শুয়ে পরিলাম। আমার শোবার পর মনে হল দেহের উপর দেড় মন ওজনের মত চাপ পরিয়াছে দেখিতেছি  কিন্তু কথা বলিবার শক্তি নাই। তৎপর মা বলিলেন ‘তুমি তো চলে যাচ্ছ? তোমার  ঝোলনা বহিবে কে? তদ্ উত্তরে বাবা(স্বামীজি)বলিলেন যার বহিবার সেই বহিবেন। তাকে তো কিছুই দিয়ে গেল না। উত্তর হল,কাটা যখন গাছ হতে বাহির হয়। কেহ চোঁখা করে দেয় না,আপনা আপনি চোঁখা হয়। আবার কত দিন পরে আসবে ১৬ বৎসর পর। তুমি যখন চলে যাচ্ছ,আমিও থাকব না। উত্তর হল,না থাকুন,চলে আসুন। আগামী রবিবার রাত্রী ১২.৩০ মি: সময় আমি আসব। আর যা হল অব্যাক্ত লেখা সম্ভব নহে,মনে হল ১০/১২ মিনিট আলোচনার পর মা বলিলেন নিখিল,অনাথ উঠ। তখন আমার দেহের উপর চাপ আর নাই। ঐ সময় কত চেষ্ঠা করিলাম কথা বলিবার পারিলাম না। মা বললেন শুনলে তো সমস্ত কথা ফিরাইতে পারিলাম না। ঐ দেহের কাজ শেষ হয়ে গেছে। এখন দেহের যা করিতে হয়,কর। এখন তরুনী দাকে ডাকিয়া উঠাইলাম। তিনি বাড়ী গিয়া গ্রামের সকল কে সংবাদ দিলেন। আমি লোক দ্বারা পাড়ার সকল কে ডাকিলাম। সকলেই আসিল। এখন সকলে সমলোচনা করিল দেহের কি করা হবে? মা কে জিজ্ঞাসা করিল,মা বলিলেন নিখিল এ দেহের অধিকারী,সে যা করার করিবে.তাতে কেহ কোন বাধা দিতে পারবে না। এখন আমাকে সকলে বলিলেন,তখন কিংকর্ত্তব্যবিমুঢ়,কি করা কর্ত্তব্য কিছুক্ষন চিন্তা করার পর,সনাতন ধর্ম্মে নির্দ্দেশ মতে দেহ ভষ্ম করা ও বৈষ্ণব সম্প্রদায়েরা সমাধি দেয়। স্বামীজি এক দিন এই কথা আলোচনা করেন। তখন আমার সেই কথা মনে পড়িল,আমি বলিলাম দেহ ভস্মীভুত করা হইবে। আমার বাড়ীর সবাই তাতে মত দিল। আমার ইচ্ছা ছিল আমি আমার ভীটার উপরই সৎকার করিব কিন্তু দু:খের বিষয় আমার পার্শ্বের বাড়ীর লোকেরা বাদী হল। শেষ পর্যন্ত সরকার পাড়া বটতলা শ্মশানে নিব,ঠিক হল। শ্মশানে নিয়ে যাবার পূর্বে মা ঘর হইতে বাহির হয়ে,বাবার মাথার নিকট বসিলেন,মুখের কাপড় নামাইয়া কপালে হাত বলিলেন“যাও”তখন দেখা গেল,মার দুই চোখের কোনে জল জ্বল জ্বল করিতেছে। তারপর হুকুম দিলেন নিয়ে যাও। শ্মশানে নিয়ে গেলাম,শ্মশানে গিয়ে দেখি,চিতা সাজান হয়ে গেছে। দেহটা আমি ‎স্নান করাইতেছি,এমন সময় দক্ষিন দিক হইতে ৫০/৬০ জন ব্যাক্তি সরকারপাড়া বটতলা শ্মশানের দিকে আসিলেন। ঐ দলের পুরো ভাগ বিলকাজুলী ব্রজলাল ছেলে,বিহারী লাল তালুকদারের লোকজন। তারা বলিলেন,দেহটাকে পোড়ানো হইতেছে কেন? তদ্-উত্তরে আমি বলিলাম “আমার বিবেক গুরুর প্রেরনায়”। ওনারা বলিলেন,দেহটাকে দিয়ে দেন আমরা নিয়ে সমাধি দেব! তদ্ উত্তরে বলিলাম,দেহের যদি অধিকার থাকতো আপনাদের,তা হলে দেহটা আপনাদের বাড়ীতে রাখিতেন। তখন বিহারী লাল গভীর স্বরে বলেন,তোমরা সবাই এখানে থাক,দেহটা যেন চিতায় না তুলিতে পারে,আমি মায়ের নিকট থেকে শুনে আসি। এই বলে ৪/৫ জন লোক নিয়ে বিহারী লাল আমাদের বাড়ীতে গেলেন মার নিকট। সরকার পাড়া বটতলা শ্মশানে লোকে লোকারণ্য নদীর ধারে পূর্ব্বে পাড়ে গুর্জ্জিয়া গ্রামের মেয়েরা আরও বহু লোক। আমি চিন্তা করিলাম,ভক্ত কবিরের দেহ নিয়ে দুই দলের বিবাদ সৃষ্টি হয়েছিল,শেষে ফুলের স্তবে নিচে দেহই নাই। তৎপর মার নিকট বিহারীলাল গিয়ে সমস্ত বিবরন বলিলেন। মা তখন বলেন ছিলেন যে,বিহারী লাল শ্মশানে গোলযোগ সৃষ্ঠি করিলে তোমরা কেহই,বাড়ী ফিরে যেতে পারবে না। শ্মশানে তালুকদারের যে সমস্ত লোক ছিল তারা কেহই বাধা সৃষ্ঠি করে নাই,কোন কথা বলে নাই। শব দেহ স্নান করানোর পর গুরুর নাম স্মরন করে চিতায় তুলে আগুন দিলাম। প্রায় ২ ঘন্টার মধ্যে দেহ শেষ হয়ে গেল। তারপর অবশিষ্ট কাজ শেষ করে,আমরা যার যার মত বাড়ী ফিরলাম। আমি বাড়ী আসিলে মা বললেন,নিখিল এসেছ? আমি সারা দিলাম। তিনি বললেন কাপড় ছেড়ে আমার নিকট আসিও। তারপর মা আমাকে বলেন,বাবা আমি আগামী কাল কি বিলকাজুলী যাব কি বল? আমি মাকে বলিলাম‘আমি  আপনাকে কোথাও যেতে দেব না। আপনি আমার নিকট থাকিবেন। আমি খাইলে আপনি খাবেন আর না খাইলে আপনি খাবেন না। এতক্ষন মার আদেশে বিহারী ও তার লোক জন আমার বাড়ীতেই বসে ছিল। মা আবার বলিলেন ১ ঘন্টার জন্য বিলকাজুলী যাব আর যাওয়া আসা যে সময় লাগে। বিলকাজুলী দূরত্ব তিন মাইল,আমি স্বীকার দিলাম,তখন মা বিহারী কে বলিলেন যাও আগামী কাল্য ১০ টা মধ্যে পালকী নিয়ে আসবে। আমি ১ঘন্টার জন্যে তোমাদের ওখানে যাব। পরদিন বিহারী লাল পালকী নিয়ে হাজির হল। মা আমাদের বলিলেন,“ নিখিল ঘড়ি দেখ”আমি ঘড়ি দেখলাম তখন ১০টা অতিবাহিত হয়েছে ঘড়িতে ১০/১৫ মিনিট বাজে। মা বললেন বিহারী আমার আর যাওয়া হল না। পালকি নিয়ে ফিরে যাও আগামীতে বাবার (স্বামীজি) যত কাগজ পত্র,কম্বল আছে,এখানে নিখিল কে দিয়ে যাবে। তার ব্যাতিক্রম যেন না হয়। বিহারীলাল তালুকদার চলে গেল,আর আমাদের এখানে এল না বা কোন জিনিষ দিল না। পরদিন মা আদেশ ২৫ খানা পোষ্ট কার্ড আনো। আমি পঞ্চানন সরকার নামে একটি ছেলে আমাদের কর্ম্মি তাকে দিয়ে ২৫ খানা পোষ্ট কার্ড আনালাম। মা বললেন ঠিকানা লেখ;পঞ্চানন লেখা শুরু করিলেন,আমার হাতে লেখার মত শক্তি নাই। ঠিকানা লেখা শেষ হল,আমি  পঞ্চানন কে বললাম পত্র লেখ,আমি মাত্র এক লাইন লিখলাম,মা বললেন রাখ,দুইটি সংবাদ এক সংগে দিও। আমি বলিলাম আমি তো বুঝিলাম না মা!। মা বলিলেন ঐ রাতের কথা তোমার স্মরন নাই। আমি ৬ ই বৈশাখ রাত্রি ১২.৩০ পর চলে যাব। আমি তো পাথরের মত হয়ে হতভম্ভ হয়ে বসে রইলাম। ২রা তারিখে বাবা চলে গেলেন,৩রা তারিখে ভস্মীভুত করিলাম আর ৪ তারিখে পত্র লেখার সময় এই আলোচনা,খবরের কাগজে মৃত্যুর সংবাদ প্রচার করি,মা নিষেধ আজ্ঞা জারী করিলেন। খবরের কাগজে দেওয়া হবে না। ঐ দিন মার আদেশে বাবার ঝোলনা খোলা হলো,তরুনী দা,অনাথ বন্ধু,মা,আমি,পঞ্চানন গীতা,ভিতরে পেলাম ২৭ //%আনা নগদ টাকা,খাতা,কাপড়,টর্স ১টি সোয়েটার,ইহা ছাড়া কিছুই নাই। ৫ই তারিখ গেল,৬ই বৈশাখ আসিল,আমার হস্ত পদ অসার হয়ে গেল,ভিতরে শুধু কম্পন। প্রায় ১১ টার দিকে যজ্ঞেশ্বর বাবু বগুড়া হইতে সোজা আমাদের বাড়ীতে উপস্থিত হলেন। প্রত্যক্ষ মার নিকট শুনলেন সব। তারপর বাড়ী চলে গেলেন,যাওয়ার সময় আবার আসিবেন বলে গেলেন কিন্তু আর আসিলেন না। ধীরে ধীরে দিবা অবসান হয়ে এল তরুনী দা,অনাথবন্ধু,আমি,পঞ্চানন বসে আছি। আমি ঘড়ি এনে ঘরে রাখিলাম। ঘড়ির কাটা ঘুরিতেছে রাত্রী ১০ টা হয়ে গেল,মা বসে ছিলেন,মুখে কোন বাক্য নাই। তারপর নন্দ মা বলিলেন “বাবা মহাপ্লাবন সমাগত কর্ম্ম যোগের আশ্রয় যদি ত্যাগ কর,তবে মহাপ্লাবন হতে উর্ত্তীন হতে পারবে না”তারপর আর কোন কথা বলেন নাই। ১২টার সময় বিছনায় শুয়ে পড়লেন। ১২.৩০ টা বাজিল হঠাৎ ঘর আলোকিত হয়ে গেল,তারপর সব শেষ! শেষ!!নিশ্বাস ত্যাগ করিলেন। পর দিন বাবার চিতার পার্শ্বে মাকে ভষ্মী ভূত করিলাম।

নিবেদক

শ্রী নিখিল গোবিন্দ দত্ত।

ওঁম শান্তি ! ওঁম শান্তি !! ওঁম শান্তি !!!

ওঁম শান্তি রেব শান্তি।