মহাযোগিনী শ্রীমাঁতা নন্দ ঠাকুরানী সংক্ষিপ্ত জীবনী
ওঁ তৎ সৎ
-ঃমহাযোগিনী শ্রীশ্রীমাঁতা নন্দ-ঠাকুরানী সংক্ষিপ্ত আত্মজীবনীঃ-
ব্রীং ধাতু উৎপত্তিগত তত্ত্ব অধিকারী মহাযোগী প্রাণাচার্য শ্রীশ্রীমৎ স্বামী ক্ষেপা জীবানন্দ পরমহংস মহারাজ (প্রকট ৯৯৮৭সাল ১৩ই ফাল্গুন বিষ্ণু সংক্রান্তি যোগে রাত্রী-১২টা ২৮মিনিট ৭ সেকেন্ড সময় আর্বিভূত হন। শংঙ্খ,চক্র গদা,পদ্ম ধারী প্রতীক স্বরূপ চিহ্ন তাঁর দক্ষিন হস্তে ছিল এবং তিনির আজানুলম্বিত বাহু ছিল) শ্রীমদ্ভগবদগীতোক্ত শারীরিক ও মানুষিক বিকাশ তরে যোগ সাধনা প্রণালী যা “সহজ কর্ম” নামে পরিচিত তা জন সাধারনের মাঝে প্রচারের নিমিত্তে মহাযোগী প্রাণাচার্য শ্রীশ্রীমৎ স্বামী ক্ষেপা জীবানন্দ পরমহংস মহারাজ সুদীর্ঘ কাল ব্যাপি নিরলোসভাবে শ্রম দিয়ে গেছেন। তাঁর প্রচারিত “সহজ কর্ম” মানব মাত্রেই সহজাত প্রাণ কর্ম বিধায় তা প্রতিটি মানব সন্তানের আচরনীয় এবং এই প্রাণ কর্ম যোগ সাধনা প্রণালী কোন বিশেষ জাতি,গোষ্ঠি,দেশ,ভাষা কিংবা ধর্মমত ভেদে ভিন্নরূপ নহে বরং এই যোগ সাধনা প্রণালী অনুশীলন প্রক্রিয়া সকলের জন্য একই প্রকার এবং যোগ সাধনার একমাত্র মুখ্য কারন হলো মানবের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ এবং আত্মার মুক্তি লাভ। এই সহজ প্রাণ কর্ম সঠিক ভাবে এবং ঐকান্তিক নিষ্ঠার সাথে অনুশীলন করলে যে মানব অপূর্ণ থেকে পূর্ণত্ব পরমানন্দ লাভ করতে পারে। তাহা ছাড়া যাবতীয় অন্ধকারাছন্ন কূহুলিকা থেকে মুক্ত হয়ে অপ্রাকৃত জ্ঞানের(ব্রহ্মানন্দ লাভ)চরমদীপ্ত শিখায় আরোহন করতে পারে। তাই এই যোগ সাধনার প্রণালীর যাহা আর এক অন্য নাম “মানব ধর্ম”,যাহা “মানব ধর্ম প্রচারক সংঘ” সংগঠনটি প্রচার করেন। মহাযোগী প্রাণাচার্য শ্রীশ্রী মৎ স্বামী ক্ষেপা জীবানন্দ পরমহংস মহারাজ এই “মানব ধর্ম প্রচারক সংঘ” এর প্রতিষ্ঠাতা এবং মহাপরিচালক ছিলেন। পরবর্তীকালে অর্থাৎ ১৩৬০ সনের ২রা বৈশাখ মহাযোগী প্রাণাচার্য শ্রীশ্রী মৎ স্বামী ক্ষেপা জীবানন্দ পরমহংস মহারাজ তিরোধানের পর ১৩৬০বাং(১৯৫৩ইং)১৪ই জ্যৈষ্ঠ,২৮শে মে রোজ-বৃহষ্পতিবার তারিখে বগুড়া জেলার ধুনট থানাধিন “ধুনট সরকার পাড়া” গ্রামে তাঁর প্রিয় ছাত্র শ্রীমৎ নিখিল গোবিন্দ দত্ত মহাশয়ের বাড়ীতে মহাযোগী শ্রীশ্রীমৎ স্বামী ক্ষেপা জীবানন্দ পরমহংস মহারাজ এবং মহাযোগিনী শ্রীশ্রীমাঁতা নন্দ-ঠাকুরানীর প্রাণ ক্রিয়ার(প্রাণ যজ্ঞের) মাধ্যমে শ্রাদ্ধক্রিয়াদি তথা প্রথম তিরোধান দিবস উৎসব পালন করা হয়। ঐ দিনই উপস্থিত সকল কর্মীভ্রাতা ও ভগ্নিগণ সর্বসম্মতি হয়ে অলিখিত ভাবে পূনঃ “মানব ধর্ম প্রচারক সংঘ” গঠন করেন এবং শ্রীমৎ নিখিল গোবিন্দ দত্ত মহাশয়কে “মহারাজ” উপাধিতে ভূষিত করে এবং তাঁকে “মানব ধর্ম প্রচারক সংঘ” এর প্রথম পরিচালক রূপে নির্বাচিত করা হয়। সেই সঙ্গে শ্রী মৎ স্বামী ক্ষেপা জীবানন্দ পরমহংস মহারাজ রাখা ঝোলনাটি তাঁর কাঁধে তুলে দেওয়া হয়। সেই দিন থেকে শ্রীমৎ নিখিল গোবিন্দ মহারাজের তাঁর উপর অর্পিত দায়িত্ব আমৃত্যু যথারীতি পালন করে গেছেন।
মহাযোগী প্রাণাচার্য শ্রীশ্রী মৎ স্বামী ক্ষেপা জীবানন্দ পরমহংস মহারাজ তাঁর প্রচার জীবনের প্রথম দিকে সিংহভাগ সময় একক ভাবে “মানব ধর্ম” প্রচার করেন। পরর্বতীকালে তিনি শ্রীশ্রীমাঁতা নন্দ ঠাকুরানীকে তাঁর প্রচার কর্মে সঙ্গীনি হিসাবে লাভ করেন। যিনি মহাযোগী প্রাণাচার্য শ্রীশ্রী মৎ স্বামী ক্ষেপা জীবানন্দ পরমহংস মহারাজের শেষ প্রয়ান দিবস পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে ছিলেন। মহাযোগী প্রাণাচার্য শ্রীশ্রী মৎ স্বামী ক্ষেপা জীবানন্দ পরমহংস মহারাজের স্বহস্তে লিখিত পান্ডুলিপি থেকে জানা যায় যে,এই শ্রীশ্রীমাঁতা নন্দ ঠাকুরানী জন্মান্তরে স্বামী জীবানন্দ মহারাজের সহধর্মিনী ছিলেন। যারঁ তৎকালিন নাম ছিল রেনুকা সুন্দরী দেবী ওরফে শান্তি দেবী। জীবানন্দ বাংলা ১১৭৬ সালের মন্বন্তরের সময় বীরভূম জেলার আনন্দ মঠ থেকে শ্রীশ্রীমৎ স্বামী সত্যানন্দ ব্রহ্মচারী কর্তৃক পরিচালিত ইংরেজদের বিরুদ্ধে সন্তান বিদ্রোহে যুগবৎ অংশগ্রহন করেছিলেন। আনন্দ মঠে মহিলাদের অনুপ্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। পরবর্তীতে রেনুকা দেবী ওরফে শান্তি দেবী পুরুষ বেশে আনন্দ মঠের সন্ন্যাসী শ্রীশ্রীমৎ স্বামী সত্যানন্দ ব্রহ্মচারী কর্তৃক সন্তান ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন এবং আনন্দ মঠের সন্তান সেনার দায়িত্ব পালন করেছিলেন সে বিষয়ে জানতে হলে জীবানন্দ এবং শান্তির শৈশব জীবন থেকে শুরু করে সন্তান বিদ্রোহের কিছু বিষয় আলোচনা করা উচিত। এখন সেদিকেই সকলের দৃষ্টি আর্কষন করছি।
শান্তির অতি শৈশবকালে মাতৃবিয়োগ হয়েছিল। তাঁর পিতা একজন অধ্যাপক ব্রাহ্মন ছিলেন। তিনি তাঁর নিজস্ব টোলে ছাত্রদের পড়াতেন,মেয়ে কুমারী শান্তি দেবী তাদের কাছে গিয়ে বসে থাকত,অন্য সময়ে তাদের সাথে খেলা করত এবং সকল কাজে তাদেরকে অনুকরন করত। এরূপভাবে নিয়ত পুরুষ সাহচার্য্যর ফলে কুমারী শান্তি দেবী পুরুষের মত কাপড় পড়ত,চুল আঁচরাতো,চন্দন মাখতো এবং সন্ধ্যাহ্নিক করত। অতি শৈশব থেকেই শান্তি দেবীর স্মরনশক্তি ও বোধগম্য শক্তি বড় প্রখর ছিল। একারনে শান্তি দেবীকে পিতা মুগ্ধোবোধ ব্যাকরণসহ কয়েকটি সাহিত্য পড়াতে লাগলেন। তারপর সব গোলমাল হয়ে গেল। পিতা পরলোক গমন করলেন। তখন শান্তি দেবী অসহায় নিরাশ্রয় সম্বলহীন হয়ে পড়েন। টোল উঠে গেল,ছাত্ররা শান্তিকে স্নেহ করলেও টোল উঠে যাওয়ার পর,যে যার মত চলে গেল। কিন্তু একজন শান্তিদেবীকে ফেলে যেতে পারলেন না। তাঁর নাম জীবানন্দ। তিনি স্বীয় শিক্ষাগুরুর একমাত্র অসহায় কন্যাটিকে সংঙ্গে নিয়ে পিত্রালয়ে আগমন করলেন। তখন জীবানন্দের পিতা মাতা বর্তমান ছিলেন। তাঁদের নিকট জীবানন্দ অসহায় কন্যাটির সবিশেষ পরিচয় দিলেন। পিতা মাতা জিজ্ঞেস করলেন,“এখন পরের মেয়ের দায়ভার নেয় কে?”জীবানন্দ বললেন,“ আমি এনেছি আমিই দায়ভার গ্রহন করব।”পিতা-মাতা বললেন,“ভালই”। কিছুদিন পর শান্তির বয়স যখন ১৬বছর পূর্ণ হলো,তখন জীবানন্দ তাকে বিবাহ করলেন। বিবাহের পর সকলেই অনুতাপ করতে লাগলেন-সকলেই বলতে লাগলেন,“কাজটা ভাল হয় নাই। কারণ শৈশব কাল থেকেই নারী সংস্পর্শে না থাকায় শান্তি কিছুতেই মেয়েদের মত কাপড় পড়ল না, চুলে বেনী বা খোপা করল না। সে পাড়ার ছেলেদের সংঙ্গে খেলা করত এবং একাকী জঙ্গলে প্রবেশ করে কোথায় ময়ূর,কোথায় হরিণ,কোথায় কোন দূর্লভ ফুল-ফল এ সকল খুঁজে বেড়াত। পুত্র বধূর এসব কীর্তি হেতু শ্রীমতি শান্তি দেবীকে শ্বশুড়-শ্বাশুড়ী প্রথমে নিষেধ,পরে ভৎর্সনা অতঃপর প্রহার করতে লাগলেন। তাতেও কাঙ্খিত ফল লাভ না হওয়ায় পরিশেষে ঘরে শিকল দিয়ে শ্রীমতি শান্তিদেবীকে কয়েদ রাখতে আরম্ভ করল। অতিরিক্ত পীড়াপীড়িতে শ্রীমতি শান্তিদেবী অতিশয় অতিষ্ঠ হয়ে একদিন গৃহের দ্বার খোলা পেয়ে গৃহ ত্যাগ করে চলে গেল। তখন বাংলা জুড়ে দলে দলে সন্যাসীরা চলাফেরা করত। শ্রীমতি শান্তিদেবী বাচ্চা সন্যাসী সেজে সন্যাসীদের সংঙ্গে কিছুদিন ভিক্ষা করে কাল যাপনের পর হঠাৎ একদিন শ্বশুড়ালয়ে উপস্থিত হল কিন্তু শ্বাশুড়ী তাকে বাড়ীতে ঢুকতে দিলেন না। কারণ জাত যাবে। শ্রীমতি শান্তি দেবী বাড়ী থেকে বের যেতে লাগল। সে সময় জীবানন্দ বাড়ীতে ছিলেন। তিনি শান্তি দেবীকে ধরে জিজ্ঞাসা করলেন,“তুমি কেন আমার গৃহ ত্যাগ করে গিয়েছিলে,এত দিন কোথায় ছিলে।” শান্তিদেবী সকল বিষয় সত্য বর্ণনা করল। জীবানন্দ বুঝলেন,শান্তিদেবীর সকল কথাই সত্য। কারন তিনি সহজেই সত্য-মিথ্যা বুঝতে পারতেন। তখন জীবানন্দ তাঁর মাকে ভাল ভাবে বুঝিয়ে,মার নিকট হতে বিদায় নিয়ে,শান্তি দেবীকে সংঙ্গে করে ভৈরবীপুরে তার ছোট বোন,নিমাইয়ের বাড়ীতে চলে গেলেন। সেখানে তাঁর ভগ্নিপতির নিকট থেকে একখন্ড জমি চেয়ে নিয়ে,একটি কুটির নির্মান করে,সেখানে সুখে শান্তিতেই দুজনে জীবন কাটাতে লাগলেন। কিন্তু সহসা সে সুখের স্বপ্ন ভঙ্গ হলো। কারণ তাদের বিবাহিত জীবনের মাত্র দুইবছর পরই জীবানন্দ আনন্দ মঠের মঠধারী সত্যানন্দ ব্রহ্মচারীর হাতে পড়ে ‘সন্তান ধর্ম’ গ্রহণপূর্বক শান্তি দেবীকে পরিত্যাগ পূর্বক চলে গেলেন। সে সময় সন্তান ধর্মে দীক্ষিত হলে কতগুলি ধারা নিয়ম প্রতিপালন করতে হতো। যেমন-(১) যখন যে কার্যে হুকুম হবে,সেই মূহুর্তেই তা প্রতিপালন করতে হবে।(২) জীবন বিপন্ন হবে,জেনেও ক্ষণমাত্র বিলম্ব না করে কার্য সম্পাদন করতে হবে।(৩) যে কোন মূহুর্তে জীবন বিসর্জ্জন দিতে দ্বিধাবোধ করা যাবে না।(৪) গৃহীত ব্রত সফল না হওয়া পর্যন্ত নিজের স্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করা যাবে না। সাক্ষাৎ করলে তাঁর প্রায়শ্চিত্ত হবে মৃত্যু। (৫) দুষ্টের দমনে করা এবং শিষ্টের পালন করা ইত্যাদি। উক্তরূপ বৈশিষ্টযুক্ত সন্তান ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার আট বছর পর শ্রীমতি শান্তিদেবীর বয়স যখন ২৬ বছর সেই সময় জীবানন্দ এক অনিবার্য্য কার্য্য উপলক্ষ্যে ভৈরবীপুরে তার ভগ্নির বাড়িতে গিয়েছিলেন। তখন তার ভগ্নি অতি কৌশলে শান্তি দেবীকে ডেকে জীবানন্দের সাথে দেখা করিয়ে দেন। তখন শান্তি দেবী তার স্বামীকে জোরপূর্বক বলতে থাকে যে,“ আপনি আমাকে গ্রহণ করুন সঙ্গে নিয়ে চলুন।”তাতে তার স্বামী আপত্তি করে এবং শান্তি দেবীকে ভয় প্রদর্শন করে চলে যায়। তখন থেকে রেনুকা সুন্দরী দেবী ওরফে শান্তি দেবী সর্বদাই চিন্তা করতে থাকে যে,কিভাবে সে সব সময় স্বামীর সঙ্গে থেকে,তাঁকে চোখে চোখে রাখতে পারে। এ বিষয়ে সে তার ঠাকুরঝি নিমাইয়ের সংঙ্গেও পরামর্শ করতে থাকে কিন্তু নিমাই তাকে কোন সু-পরামর্শ দিতে পারে না। তখন শান্তি দেবী নিজ বুদ্ধিবলে মাথায় জটাধারন ও গৈরিক বস্ত্র পরিধান করে,গাত্রে বৈষ্ণবদের মত বেহাল ধারন করলেন এবং কৃত্রিম গোঁফ-শ্বশ্রু লাগিয়ে বাড়ি হতে বর্হিগমণ করলেন এবং নানা স্থানে ভ্রমণ করে,তার স্বামীর অনুসন্ধান করতে লাগলেন। একদিন দেখলেন কিছুসংখ্যক সন্তান দল একস্থানে বেশকিছু মালামাল লুন্ঠন করছে এবং সেখানে তার স্বামীও বিদ্যমান আছেন। তখন শান্তিদেবীও সেই লুটের কার্য্যে যোগ দিল। কার্য-সমাধার পর শান্তি দেবীর স্বামী দেখলেন যে এ লোক কে? কারণ শান্তি দেবীর স্বামীই একমাত্র সকল সন্তানকে চিনতেন। অন্য কেহই সকল সন্তানকে চিনতেন না। কাজেই তাঁর সন্দেহ হলো। যেহেতু ইতিপূর্বে এই বেশধারী কোন সন্তানকে তিনি দেখেন নাই। তখন শান্তির স্বামী জীবানন্দ আগত নতুন লোকটিকে জিজ্ঞাসা করলেন,“তুমি কে,এ সন্তানদলে আসলে কি প্রকারে?” তুমি তো সন্তান ধর্মে দীক্ষিত হও নাই। তুমি আমাদের দলে মিশলে কি প্রকারে? তখন শান্তি দেবী বলল,আপনি একটু নির্জনে গমন করলে সকল বিষয় আপনার গোচরীভূত করতে পারি। তারা দুজনেই একটু দুরে সরে গেলেন। তখন রেনুকা সুন্দরী দেবী ওরফে শান্তি দেবী স্বামী পাদস্পর্শ করে বললেন,“ আপনি আমায় চিনতে পারছেন না প্রভূ! আমি আপনার দাসী রেনুকা। আপনি আমাকে ভূলে গিয়েছেন কিন্তু আমি আপনাকে ভূলি নাই। আমি আপনার ধর্মে বিঘ্নকারী নই,সাহায্যকারী। আর আমি এও জানি যে,আপনি যখন আমার সংঙ্গে একবার সাক্ষাৎ করেছেন তখন আপনার প্রায়চিত্ত প্রাণ ত্যাগ। আর আপনিও সেই প্রাণ ত্যাগের সুযোগ খুঁজছেন। কিন্তু আমি যে আপনার জীবন মরনের সংঙ্গিনী। আপনি কি করে আমায় ত্যাগ করলেন? এখন আপনার কাছে আমার এই আকূল প্রার্থনা,কি করে সন্তানধর্মে আমি দীক্ষিত হতে পারি এবং দেশমাতৃকার জন্য জীবন উৎসর্গ করতে পারি,দয়া করে তাহা উপদেশ করুন।” এই কথা শ্রবন করার পর রেনুকা দেবীর স্বামী জীবানন্দ রেনুকাকে বললেন,“তুমি একটু পরে এস,আমি আগে গিয়ে মঠধারীকে তোমার বিষয় জানাই। পরে যা হয় হবে।” এই কথার পর রেনুকার স্বামী জীবানন্দ মঠে চলে গেলেন এবং মঠধারী সত্যানন্দ ব্রহ্মচারীকে সকল কথা সবিস্তারে বললেন এবং জীবন বিসর্জন দিবার সংকল্প করলেন। তখন মঠধারী চমকিত হয়ে বললেন,“এখন তোমার মরা হইবে না,মরিবার বহু সময় আছে। এমন দিন আসিবে যে,সেদিন তোমার মৃত্যুতে বঙ্গদেশে বহু উপকার সাধন হইবে। এখন মরিলে এই সন্তান ধর্ম একেবারে লোপ পাইবে। কাজেই এখন তোমার মরা হইবে না,এখন তুমি গড়মন্দারের মহেন্দ্র সিংহের নিকট গিয়া তাহাকে যাহাতে সন্তান ধর্মে দীক্ষিত করা যায় তাহার ব্যবস্থা কর,কেননা উহার দ্বারা আমাদের বহু কার্য্য সমাধান হইবে। পরে আর যাহা করতে হয় যথা সময়ে তা বলল।”এই কথা শ্রবণ করে রেনুকা দেবীর স্বামী জীবানন্দ জমিদার মহেন্দ্রের নিকট চলে গেল। পরে রেনুকা দেবী(শান্তী দেবী)মঠে এসে মঠধারীকে সম্মান প্রদর্শন করতঃ দন্ডায়মান হলে,মঠধারী সত্যানন্দ ব্রহ্মচারী বললেন,“তুমি এই মঠে একটি প্রকোষ্ঠে অবস্থান করগে। কল্য তোমাকে দীক্ষিত করব।”এই কথা শুনে রেনুকা তার স্বামীর ঘরটি খুঁজে বের করলেন এবং ঘরের মধ্যে গিয়ে নিদ্রা যেতে লাগলেন। পরে কিছু রাত্রে রেনুকার স্বামী(জীবানন্দ) নিজ প্রকোষ্ঠে প্রবেশ করেই বুঝতে পারলেন যে,এখানে কোন লোক আছে এবং এটাও বুঝতে পারলেন রেনুকা ব্যতিত এ প্রকোষ্ঠে অন্য কেহ প্রবেশ করতে পারে না। তখন জীবানন্দ অন্য প্রকোষ্ঠে প্রবেশ করলেন। পরে রেনুকা আবার উক্ত প্রকোষ্ঠে গিয়ে উপস্থিত হলো। তখন জীবানন্দ রেনুকাকে বললেন,“তুমি আবার এ প্রকোষ্ঠে আসলে কেন? যদি মঠধারী জানতে পারেন,তবে মহাবিপদ হবে। তখন রেনুকা বললেন যে,“আমি আপনার পদ প্রান্তে কাল যাপন করব বলে এসেছি,এতে আপনি আমায় বঞ্চিত করবেন না। যদি মঠধারী এ জন্য আমাদেরকে যে শাস্তি দেন,তাহা আমাদের জন্য সৌভাগ্যর বিষয় হবে। কেননা শাস্তিতো জীবন বিসর্জন। তাতে ভয় নাই এবং এক চিতায় জীবন লীলার শেষ করব আবার জন্মান্তরে আমাদের মিলন হবে। তাতে আর দুঃখ কি? তবে দুঃখের বিষয় এই যে,দেশের কোন উপকার করতে পারলাম না। আমরা মঠধারীকে বলব যে,আমাদের প্রায়শ্চিত্ত করার জন্য আমরা প্রস্তুত কিন্তু আমাদেরকে কিছু দেশের কার্য করে যেতে দিন। তাঁর কাছে ভিক্ষা নিয়ে কিছুদিন দেশের সেবা করব,তারপর দুজনে জীবন বির্সজন দিব। তাহলে মঠধারী নিশ্চয় আমাদের প্রার্থনা পূরন করবেন। তার জন্য আপনি বিচলিত হচ্ছেন কেন? তখন জীবানন্দ অগত্যা স্বীকৃত হয়ে নিজ প্রকোষ্ঠে গিয়া প্রবেশ করলেন এবং উভয়েই এক সঙ্গে নিশিযাপন করতঃ প্রাতঃক্রিয়া সমাপন করার পর রেনুকা দেবী মঠধারী সত্যানন্দ ব্রহ্মচারীর নিকট গমন করলেন এবং রাতের সমূদয় ঘটনা আনূপূর্বক সবিস্তারে বর্ননা করলেন। তাতে মঠধারী আনন্দিত হয়ে বললেন,“বৎস তোমার সরলতায় আমি মুগ্ধ হইলাম। তুমি যে কি? দেব স্বভাবেও কিছু কলঙ্ক আছে; আর দেখিতেছি তোমাতে কলঙ্কের লেশমাত্র নেই। যাহা হউক আমি পরম পিতার কাছে প্রার্থনা করছি যে,তোমরা উভয়েই দেশের সেবা করিয়া জগতে গৌরাবান্বিত হও। তখন হইতে রেনুকা দেবী(শান্তি দেবী) ও জীবানন্দ এক সঙ্গে দেশের কার্য্য করতে লাগলেন। সেই দিনই গড় মন্দারনের জমিদার মহেন্দ্র সিংহ ও রেনুকা দেবীকে সত্যানন্দ ব্রহ্মচারী কর্তৃক দীক্ষিত করা হলো। রেনুকা দেবী পুরুষ সন্যাসীর বেশে পরীক্ষিত হয়ে দীক্ষিত হলো। দীক্ষা দানের পর তার নাম রাখা হলো নবীনানন্দ। নবীনানন্দ,জমিদার মহেন্দ্র সিংহ সহ গড় মন্দারনে রাজধানীতে গমন করলেন এবং সেখানে এসে বহু অস্ত্র-শস্ত্র,কামান,বন্দুক ও গোলা বারুদ প্রস্তুত করাতে লাগলেন। ইংরেজ বিরোধী যুদ্ধে এই সকল অস্ত্র-শস্ত্র ব্যবহার হয়েছে। এমন ভাবে রেনুকা দেবী ওরফে শান্তি দেবী এবং তার স্বামী জীবানন্দ যুগবৎ সন্তান ধর্মে দীক্ষিত হয়ে আনন্দ মঠে সন্তান সেনার দ্বায়িত্ব পালন করেছিলেন। এদিকে তৎ কালিন অবিভক্ত বাংলার মুসলিম শাসক মীরজাফর ও তদীয় পুত্র সন্তান বিদ্রোহ দমনে ব্যর্থ হলে তারা ইংরেজ কুলের শিরোমনি গর্ভনর জেনারেল ওয়ারেন হেষ্টিংস সাহেব ১১৭৭ সালে ক্যাপটেন টমাসকে সন্তান বিদ্রোহ দমনে প্রেরন করেন। ঐ যুদ্ধে ক্যাপ্টেন টমাস স্বসৈন্যে নিহত হন এবং অন্য দিকে বহু সন্তান সেনাসহ সন্তান বাহিনীর সম্মুখ যোদ্ধা বলে খ্যাত প্রধান সেনাপতি ভবানন্দ নিহত হন।
১১৭৭ সালে ক্যাপ্টেন টমাসের পরাজয়ের পর উত্তর বাংলা মুসলিম শাসনের হাতছাড়া হয়ে যায়। তখন কলকাতার গর্ভনর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস সাহেব সন্তান শাসনার্থে অবিলম্বে মেজর এডওর্য়াড নামে একজন সেনাপতিকে বিপুল নতুন সৈন্যসহ পূনরায় প্রেরণ করলেন। তখন ১১৭৮ সাল মাঘীপূর্ণিমা সম্মুখে উপস্থিত। মহেন্দ্র সিং এর রাজবাড়ী গড় মন্দাররন ও বক্রেশ্বর সন্যাসী মেলার মধ্যবর্তী স্থানে রাইপুরের নিকট ইংরেজ সৈন্যের ছাউনি স্থাপিত হয়েছে। ইংরেজ শিবিরের অদূরবতী স্থানে নদীতীরে মাঘীপূর্ণিমা উপলক্ষে একটি বড় মেলা হবে। মেলার নাম বক্রেশ্বর সন্যাসী মেলা। এই মেলায় স্নান উপলক্ষ্যে লক্ষ লক্ষ পূণ্যার্থীর সমাগম হয়ে থাকে। এর মধ্যে গত বছর ইংরেজবিরোধী যুদ্ধে সন্তানগণ জয়লাভ করায় এবার বৈষ্ণবদের রাজ্য হয়েছে। সুতরাং সন্তানগণ মহাসমারোহে মেলায় উপস্থিত হয়ে জাঁকজমক করবে তাতে সন্দেহ নাই। এমনি ধারনা করে মেজর এডওর্য়াড বিবেচনা করলেন যে,মহেন্দ্র সিং এর গ্রাম “পদচিহ্ন” হতে রাজবাড়ী গড় মন্দারনের রক্ষকেরাও সকলেই মেলায় আসিবার সম্ভবনা বেশী সেই সুযোগে সহসা পদচিহ্নে আক্রমন করে দূর্গ অধিকার করবেন। অন্য দিকে মেলা আক্রমন করে নিরস্ত্র সন্তানদিগকে নিঃশেষ করবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মেজর এডওর্য়াড এর কৌশল ব্যর্থ হলো কারন এই যুদ্ধের সংবাদ প্রচারিত হওয়ার পর সন্তানগণ অস্ত্র-শস্ত্র সহ মেলায় এসে হাজির হতে শুরু করল। এদিকে মাঘীপূর্ণিমার পূণ্য দিনে,শুভক্ষণে পবিত্র জলে প্রাণ বিসর্জন করে,প্রতিজ্ঞা ভঙ্গের মহাপাপের প্রায়চিত্ত করবেন,এই অভিসন্ধি স্থির করে জীবানন্দ ও শান্তি দেবী পদচিহ্ন গ্রাম থেকে বের হলেন। পথে যেতে যেতে শুনলেন যে,মেলায় সমবেত সন্তানদিগের সঙ্গে ইংরেজ সৈন্যের মহাযুদ্ধ হবে। তখন জীবানন্দ বললেন,“তবে যুদ্ধেই মরব,শীঘ্র চল।”তখন দুইজনে পরামর্শ করে জীবানন্দ এক বনে লুকালেন এবং শান্তি নবীনানন্দের ছদ্মবেশ পরিত্যাগ করে এক বৈষ্ণবীর বেশ ধারন এবং একটি সারঙ্গ হস্তে ইংরেজ শিবিরে গিয়ে উপস্থিত হলেন এবং গান গেয়ে শিবিরের সৈন্যদের নিকট ভিক্ষা করতে করতে কাপ্তেন সাহেবের কাছে চলে গেলেন। কাপ্তেন সাহেব আবার তাকে মেজর সাহেবের নিকট নিয়ে গেলেন। মেজর সাহেব বললেন,“তুমি যদি গড় মন্দারনে কত সৈন্য আছে তাহা দেখে এসে আমাকে বলতে পার তবে তোমাকে ১০০টাকা পুরষ্কার দিব।” এই কথা বলে তার হাতে ১০০টাকা প্রদান করলেন। সেই সঙ্গে বৈষ্ণবীকে গড়মন্দারনে পৌঁছাইয়া দিবার জন্য একজন অশ্বারোহী সৈনিককে সাথে দিলেন। পথিমধ্যে এসে শান্তি দেবী ঐ সৈনিকের নিকট হতে অশ্বটি কেড়ে নিয়ে ঐ অশ্বের পদতলে সৈনিকের জীবনলীলা সাঙ্গ করে দিয়ে দ্রুত জীবানন্দের নিকটে এসে সকল বিষয় খুলে বললেন। তখন সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে দুইজনে স্থির করলেন যে,জীবানন্দ মেলায় যাবেন এবং মেলা অভিমুখ হতে সন্তানসেনা দল সহ ইংরেজ শিবির আক্রমণ করবেন অন্যদিকে শান্তি দেবী পাঁচ শত শিক্ষিত সেনা এবং পাঁচটি কামান নিয়ে শিবিরের পিছন দিক হতে আক্রমন করবেন। এভাবে প্রস্তুতি নিয়ে তারা যুদ্ধে অবতীর্ন হলেন। প্রথম দিকে বহু সন্তানসেনা ইংরেজের কামানের গোলার আঘাতে নিহত হল,এমন কি স্বয়ং জীবানন্দ গোস্বামী যুদ্ধে চৈতন্য হারিয়ে ফেললেন। কিন্তু পিছন দিক হতে যখন হঠাৎ নবিনানন্দ ওরফে শান্তি দেবীর নেতৃত্বে পরিচালিত কামান মূহুমূর্হু প্রচন্ড বেগে গোলা বর্ষন করতে আরম্ভ করল তখন অতি অল্প সময়ের মধ্যে ইংরেজ শিবির লন্ডভন্ড হয়ে গেল। ইংরেজ সৈন্যগণ যেন উড়ন্ত পতঙ্গের ন্যায় নবিনানন্দের কামানের অগ্নিতে আত্মবিসর্জন দিতে লাগল। তারপর গোটা যুদ্ধস্থল যেন এক প্রেতপুরিতে পরিনত হলো। যুদ্ধকালীন সেই ঘোড়ার দৌড়াদৌড়ি,বন্দুকের কড়করি,কামানের গুমগুম সর্ব্ব্যপী ধুম,এসব আর কিছুই নেই। কেহ জয়ধ্বনি করছেনা,কেহ হরিধ্বনি করছেনা। শব্দ করছে কেবল শৃগাল,কুকুর আর গৃধিনী আর সর্ব্বোপরি আহত ব্যক্তির ক্ষনিক আর্ত্তনাদ। কেহ ছিন্ন হস্ত,কেহ ভিন্ন মস্তক,কারও পা ভেঙ্গেছে,কারও পাঞ্জর বিদ্ধ হয়েছে,কেউবা ঘোড়ার নিচে পড়েছে। কেউ ডাকছে,মা!কেহ ডাকছে বাবা! কেহ চায় জল,কারও কানা মৃত্যু। হিন্দু,মুসলমান,হিন্দুস্থানী,ইংরেজ একত্রে জড়াজড়ি; জীবন্তে মৃতে,মনুষ্যে অশ্বে,একত্রে মিশামিশি ঠেসাঠেসি হয়ে পড়ে রয়েছে। সেই মাঘীপূর্নিমার রাত্রে,দারুন শীতে,উজ্জ্বল জ্যোৎস্নালোকে রনভূমি এতটাই বিভৎস ভয়ংকর রূপ পরিগ্রহ করেছিল যে,সেখানে আসতে কারও সাহস হয় না। কারও আসতে সাহস না হলেও সেই ভয়ংকর নিশিথে শান্তি দেবী একা এক রমণী,সেই তাঁর স্বামী জীবানন্দ গোস্বামীর দেহটি খুঁজতেছিলেন। তিনি একের পর এক মৃতদেহ উল্টিয়ে সারা রণক্ষেত্র ব্যাপী দেখতে লাগলেন কিন্তু কোথাও তাঁর অনুসন্ধান না পেয়ে হাতের মশাল ফেলে দিয়ে,ভূমিতে লুটিয়ে পড়ে কাঁদতে লাগলেন। ঠিক সেই মূর্হুতে এক অতি মধুর সকরুন ধ্বনি তাঁ কানে প্রবেশ করল। কে যেন বলল,“উঠ মা! কাঁদছ কেন?”শান্তি দেবী চেয়ে দেখল,সম্মুখে জ্যোৎস্নালোকে দাড়িয়ে অতি অপূর্ব দৃশ্যে সুশোভিত জটাজুটধারী এক বিরাটদেহী মহাপুরুষ। তাঁকে দেখে শান্তি দেবী উঠে দাঁড়ালেন। মহাপুরুষ বললেন,“কেঁদো না মা! তুমি আমার সঙ্গে এসো,জীবানন্দের দেহ আমি খুঁজে দিচ্ছি। তখন সেই মহাপুরুষ শান্তি দেবীকে রণক্ষেত্রের মধ্যস্থলে নিয়ে গেলেন; সেখানে অসংখ্য শবরাশি উপয্যুপরি পড়ে আছে। শান্তি দেবী একা সেই সকল শবরাশি সরাতে পারে নাই। সেই মহাবলবান মহাপুরুষ ঐ সকল মৃতদেহ সরিয়ে এক মৃতদেহ বের করলেন। শান্তি দেবী দেখলেন,সেইটি জীবানন্দের দেহ। তাঁর সর্ব্বাঙ্গ ক্ষতবিক্ষত রক্তে রক্তাক্ত। শান্তি দেবী উচ্চঃস্বরে কাঁদতে লাগলেন। মহাপুরুষ আবার বললেন,“কেঁদো না মা! জীবানন্দ মরে নাই।” তুমি স্থির হয়ে ওর দেহ ভাল করে পরীক্ষা করে দেখ। শান্তি দেবী নাড়ী টিপে দেখল কিন্তু কিছুমাত্র গতি অনুভব করল না। পরে বুকে হাত দিয়ে দেখল,নাকের কাছে হাত দিয়ে দেখল,মুখের মধ্যে আঙ্গুল দিয়ে দেখল কিছুমাত্র উষ্ণতাও পাওয়া গেল না। তখন মহাপুরুষ বাম হস্থে জীবানন্দের দেহ স্পর্শ করলেন এবং একটু পরে বললেন,“তুমি হতাশ হয়েছ! তাই বুঝতে পার নাই। এখন আবার দেখ দেখি।”শান্তি দেবী তখন আবার নাড়ী টিপে দেখল,কিছু গতি আছে। তখন বিস্মিত হয়ে হৃদপিন্ডের উপরে হাত রেখে দেখল একটু ধুক ধুক করছে। নাকের আগে আঙ্গুলি দিয়ে নিঃশ্বাস বইছে। শরীরেও উষ্ণতার আভাস পাওয়া গেল। শান্তি দেবী বিস্মিত হয়ে মহাপুরুষকে বললেন,“প্রাণ ছিল কি? না আবার এসেছে? মহাপুরুষ বললেন,তাও কি হয় মা! এখন তুমি ওকে কোলে করে পুষ্করিনীর পাড়ে নিয়ে যাও। আমি ঔষধ নিয়ে আসছি।
শান্তি দেবী জীবানন্দকে কোলে করে পুষ্করিনী তীরে নিয়ে গিয়ে শরীরের রক্ত ধুয়ে দিল।তখনই চিকিৎসক ঔষধি বনলতা পাতার প্রলেপ নিয়ে এসে সকল ক্ষতমুখে লাগিয়ে দিলেন,তারপর বারংবার জীবানন্দের সর্ব্বাঙ্গে হাত বুলিয়ে দিলেন। তখন জীবানন্দ এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে উঠে বসলেন। শান্তি দেবীর মুখপানে চেয়ে জিজ্ঞেস করলেন,“যুদ্ধে কার জয় হলো?”শান্তি দেবী বললেন,“যুদ্ধে তোমারই জয় হয়েছে,সন্তানদের জয় হয়েছে। এখন এই মহাত্মাকে প্রণাম কর।” তখন উভয়ে তাকিয়ে দেখল কোথাও কেউ নাই,কাকে প্রণাম করবে! জীবানন্দ বললেন,“শান্তি! সেই চিকিৎসকের ঔষধের আশ্চর্য্য গুণ! আমার শরীরে আর কোন বেদনা বা গ্লানি নাই,এখন কোথায় যাবে চল। ঐ শোন সন্তান সেনাদের বিজয় উৎসবের কোলাহল শোনা যাচ্ছে,চল সেখানে যাই।”শান্তি দেবী বললেন,“আর ওখানে না। দেশমাতৃকার কার্য্যোদ্ধার হয়েছে। এদেশ এখন সন্তানদের হয়েছে। আমরা রাজ্যের ভাগ চাই না,এখন কি জন্য ওখানে যাব?”জীবানন্দ বললেন,“অনেক কষ্টে যে দেশমাতৃকাকে শত্রুমুক্ত করলাম তাকে তো বাহু বলেই রক্ষা করতে হবে।” শান্তি দেবী বললেন,“দেশমাতৃকার রক্ষার জন্য স্বয়ং সত্যানন্দ ব্রহ্মচারী আছেন। তাছাড়া আরও অনেক বীর সন্তানগণ রয়েছেন। তুমি প্রায়শ্চিত্ত করে সন্তান ধর্মের জন্য দেহ ত্যাগ করেছিলে;মহাপুরুষের কৃপায় ফিরে পাওয়া এ দেহে সন্তানের আর কোন অধিকার নাই। আমরা সন্তানের পক্ষে যুদ্ধে মৃত্যুবরণ করেছি মনে কর। নচেৎ এখন আমাদের দেখলে অন্যান্য সন্তানরা বলবে,“জীবানন্দ যুদ্ধের সময়ে প্রায়শ্চিত্ত ভয়ে লুকিয়ে ছিল। এখন জয়লাভ করায় রাজ্যের ভাগ নিতে এসেছ। তাছাড়া যে দেহ তুমি মাতৃসেবায় জন্য একবার পরিত্যাগ করেছ তা যদি পূর্নবার একই কাজে নিয়োজিত কর তবে তোমার প্রায়শ্চিত্ত কি হলো? এক্ষনে মাতৃসেবায় বঞ্চিত হওয়াই এ প্রায়শ্চিত্তের প্রধান অংশ। নইলে তোমার মত বীর সন্তানের জন্য শুধু তুচ্ছ প্রাণত্যাগ কোন একটা কাজ নয়।”
শান্তি দেবীর পরামর্শে জীবানন্দ প্রীত হলেন এবং বললেন,“তুমি যথার্থ বলেছ। আমি এ প্রায়শ্চিত্ত অসর্ম্পূন রাখব না। কিন্তু এই সন্তান ধর্ম ত্যাগ করে কোথায় যাব? যে মাতৃসেবায় নিজেকে একবার সমর্পন করেছি তা ত্যাগ করলে তো গৃহে গিয়া কখনই সুখী হতে পারবো না।” তখন শান্তি দেবী বললেন,আমি তোমাকে গৃহে ফিরে যেতে বলছি না; আমরা আমরা এখন আর গৃহি নহি। আমরা এতদিন যেমন ব্রহ্মচর্য্য ব্রত পালন করেছি,তেমনি এখন হতে চির ব্রহ্মচর্য্য ব্রত পালন করবো। চল এখন গিয়ে আমরা দেশে দেশে তীর্থ দর্শন করে বেড়াই। তারপর হিমালয়ের উপর কুটির প্রস্তুত করে,দুই জনে দেবতার আরাধনা করেবো যাতে দেশমাতৃকার মঙ্গল হয়,সেই বর প্রার্থনা করবো। জীবানন্দ বললেন,“তবে এখনি চল”।তখন দুই জনে এক সাথে হাত ধরাধরি করে উঠে জ্যোৎশ্নাময় নিশীথে অনন্তে অন্তর্হিত হলেন। তখন হতে রেনুকা দেবী এবং জীবানন্দ এক সংঙ্গে থেকে যোগ সাধনায় মনোনিবেশ করলেন। এদিকে এই যুদ্ধের পর বঙ্গদেশে বহু গোলযোগ আরম্ভ হলো কারন গৈরিক বসন পরিহিত সাধু- সন্যাসী দেখলেই রাজকর্মচারীরা তাদের গ্রেফতার করতে লাগলেন। তখন সন্তানগণ গৈরিক বস্ত্র ত্যাগ করতঃ গৃহির বেশ ধারন পূর্বক সকলেই গৃহি হলেন। তখন সময় সময় স্থানে স্থানে লুটতরাজ এবং খন্ড যুদ্ধ চলতে লাগলো। তার কিছু দিন পরই দশসালা বন্দোবস্ত আরম্ভ হলো। তখন বঙ্গদেশকে খন্ড খন্ড ভাগে বিভক্ত করে জমিদারী প্রথা প্রবর্তন হলো। একারনে সন্তানদিগের বিদ্রোহ একেবারে থেমে গেল। কিন্তু ‘প্রেমানন্দ’ নামে এক সন্তান রেনুকা দেবীকে জীবানন্দর সঙ্গে দেখে তার যৌবনোদ্দীপ্ত রূপগুণে মুগ্ধ হয়ে তাকে লাভ করার জন্য ঘোর তপস্যা করতে লাগল। তখন হতে রেনুকা দেবীর যোগশক্তি নষ্ট হতে থাকে এবং শরীর ক্রমাগত খারাপ হতে থাকে। এ প্রকারে কিছুদিন গত হওয়ার পর ১২৯২ বাংলা সনে রেনুকা দেবীর দেহপাত হয় এবং সাওতাল পরগণার নওয়ারপাড়া গ্রামে জন্ম গ্রহণ করে। তখন তার নাম রাখা হয় সরোজিনী। প্রেমানন্দ তখনও রেনুকা দেবীকে লাভ করবার আশায় তপস্যায় রত থাকে। কিছুদিন পরপ্রেমানন্দের দেহত্যাগ হয় এবং বীরভূম জেলার রামনগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করে ও যতীন্দ্র নামে নামে খ্যাত হয়। এখন সময় সরোজিনীর মৃত্যু হয়ে বর্ধমান জেলার ভাতার গ্রামে জন্ম হয় এবং কুমুদ কামিনী নাম ধারন করে।এর কিছুদিন পর যতীন্দ্রের মৃত্যু হয় এবং মুর্শীদাবাদ জেলার মীরে নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করে সীতানাথ নামে খ্যাত হয়। তার কিছুদিন পরকুমুদ কামিনীর মৃত্যু হয় এবং বীরভূম জেলার মহেশ্বরপুরে জন্মগ্রহন করে,লক্ষ্মী নামে অভিহিতা হয়। অতঃপর সীতানাথের মৃত্যু হয়ে মুর্শিদাবাদে পেটকারীর চরে জন্ম গ্রহন করে এবং লক্ষ্মীরও মৃত্যু হয়ে রাজশাহী জেলায় জন্ম হয়। এই জন্মে উভয়ের বিবাহ সূত্রে মিলন হয়। কিন্তু এতদিনে যোগসাধনা যে কি বিষয় তা দুইজনেই ভূলে গিয়াছে। ওদের বিবাহের পর জীবানন্দ মহারাজ একদিন কর্ম্মযোগে বসে ধ্যানস্থ অবস্থায় দু’জনের পূর্বজন্মের ঐরূপ চিত্র অবগত হন এবং তাঁর পান্ডুলিপিতে লিপিবদ্ধ করেন। স্বামীজী(জীবানন্দ) নন্দমাকে “মাতা ঠাকুরানী” বা “নন্দমা” বলে সম্বোধন করতেন। কখনও বা “মা” বলে ডাকতেন। জন্মান্তরের মধ্যে দিয়ে এই মাতা ঠাকুরানী রাজশাহী জেলায় জন্মের পর তার মৃত্যু হলে তিনি পরর্বতীতে পাবনা জেলার ঈশ্বরদীর নিকট দাসুরীয়া বাজার থেকে পশ্চিম দিকে অবস্থিত কাঁঠাল পুলি গ্রামে নরসুন্দর পরিবারে জন্ম গ্রহন করেন। সেখানে জন্মগ্রহনের নয়(৯)বছর বয়সে তার বিবাহ হয়। কিন্তু তাঁর স্বামীর অকাল মৃত্যু হলে তিনি পিতৃ গৃহে ফেরত আসেন। কিছুদিন পর তার বাবার মৃত্যু হলে তাকে দেখার জন্য কেউ থাকে না। তখন প্রতিবেশীগণ তাকে ভ্যাগ ধারণ করিয়ে এক বৈরাগীর হাতে সমর্পন করেন। কিন্তু ঐ বৈরাগীর সাথে তার মতের মিল না হওয়ায় দুজনের মধ্যে কখনোই বনিবনাত হতো না। বৈরাগী প্রায়ই মাতা ঠাকুরানীকে মারধর করত। একদিন এই বৈরাগীর সঙ্গে নাটোরে অবস্থান কালে দুইজনের কি একটা মতবিরোধ হয় এবং বৈরাগী মাতা ঠাকুরানীকে মারপিট করে,নদীয়া জেলার কেচুয়াডাঙ্গা আশ্রমে পালিয়ে যায়। এখানে একটা কথা বলা দরকার তা হলো জীবানন্দ যখন খাগরার পরপাড়ে মালদহ জেলার রাধারঘাট শ্মশানে ধর্ম্মদাস বাবাজীর আশ্রমে অবস্থান করেন তখন মাতা ঠাকুরানী তার বৈরাগীসহ ঐ আশ্রমে আসেন। ঐ বৈরাগীর একটি গোপন ব্যাধি ছিল। ঐ ব্যাধি নিরাময়ের কোন ব্যবস্থা আছে কি না তা জানান জন্য তিনি স্বামীজী জীবানন্দকে ধরে বসেন। স্বামী জীবানন্দ তাকে বলেন,“তুমি যদি যোগ কর্ম্ম গ্রহন কর এবং তা ঠিকভাবে অনুশীলন কর তবে তোমার ব্যাধি নিরাশয় হতে পারে।” তখন স্বামী জীবানন্দর নিকট থেকে ঐ বৈরাগী কর্ম্ম জেনে নেয় এবং মাতা ঠাকুরানীও পাশে থেকে স্থির চিত্তে ঐ যোগকর্ম্ম দেখে নেয়। পরে বৈরাগী বাবাজী কর্ম্ম ছেড়ে দেয় কিন্তু মাতা ঠাকুরানী কর্ম্ম করে যায়। কিছুদিন পর তারা তিনজন একসাথে নাটোরে পূর্নবাবুরবাড়ী আসেন। সেখানেই পূর্বোক্ত ঘটনা ঘটে। তখন মাতা ঠাকুরানী বাবাজী কর্তৃক লাঞ্চিত হয়ে ক্রন্দন করতে ছিলেন। এই অবস্থা দেখে পূর্ণ বাবু স্বামী জীবানন্দকে বললেন,“আপনি ইঁনাকে সঙ্গে নিয়ে যান।” কেচুয়া ডাঙ্গা আশ্রমে পৌছাইয়া দিবেন।”অগত্যা স্বামীজী জীবানন্দ তাই করলেন। এদিকে ঐ বৈরাগী বাবজী কেচুয়া ডাঙ্গা গিয়ে সকলকে বলেছে যে,“শ্যামক্ষেপা (জীবানন্দ) আমার বৈষ্ণবীকে নিয়ে গিয়েছে।” স্বামীজী(জীবানন্দ) সেখানে উপস্থিত হওয়ার পর সকলের ভ্রান্তি দুর হলো। তখন স্বামীজী(জীবানন্দ) গ্রামের কয়েকজন মাতব্বত শ্রেনীর লোক ডাকালেন এবং তাদের সামনে ঐ বাবাজীকে বললেন,“আপনি যে এই স্ত্রী লোকটাকে নাটোরে মারপিট করে ফেলে আসলেন,আমি যদি সেখানে না থাকতাম তবে তার কি অবস্থা হতো।”তখন ঐ বাবাজী বলল,“ আমার সংগে বনিবনাত হয় না। সুতরাং আমি আর ওকে নিতে নারাজ। তখন হতে মাতা নন্দ ঠাকুরানী স্বামীর(জীবানন্দ) সংগেই থেকে গেলেন। স্বামীজী গৃহীদের মধ্যে এই যে কর্ম্ম যোগ প্রচারের স্বার্থে তাঁর সাধনা শক্তি মাতা নন্দ ঠাকুরানীর মধ্যে অনুপ্রবিষ্ট করিয়ে তাঁকে তাঁর যথার্থ প্রচার সঙ্গিনী রূপে গড়ে তোলেন। মাতা নন্দ ঠাকুরানী ও স্বামীর(জীবানন্দ) সংগে থেকেই অতি অল্প সময়ের মধ্যেই যোগ সিদ্ধা হন এবং তারা যুগলে জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত সহজ কর্ম্ম প্রচার করে গেছেন।
এই মহীয়সী নারী বিগত বাংলা ১৩৬০ সনের ৬ই বৈশাখ রোজ-রবিবার রাত্রি ১২টা ৩০মিনিটে ধুনট সরকার পাড়া গ্রামে শ্রীমৎ নিখিল গোবিন্দ দত্ত মহাশয়ের বাড়ীতে তাঁর নশ্বর দেহ ত্যাগ করেন। ধুনট সরকারপাড়া মহাশ্মশানে তাঁর পরিত্যাক্ত দেহের সৎকার করা হয়।
নন্দমাতার জন্মান্তর কথার মধ্যে আমরা শ্রী মদ্ভগবদগীতোক্ত বানীর বাস্তব প্রতিফলন দেখতে পাই। গীতার ৬ষ্ঠ অধ্যায়ে অর্জুন ভগবন শ্রী কৃষ্ণকে বলছেন-
অযতিঃ শ্রদ্ধয়োপেতো যোগাচ্চলিত মানসঃ।
অপ্রাপ্য যোগ সংসিদ্ধিং কাং গতিং কৃষ্ণ গচ্ছতি।।৬/৩৭
অর্থাৎ অর্জূন বললেন,হে পার্থ,শুভকর্ম্মের অনুষ্ঠানকারী পরমার্থবিদের ইহলোকে এবং পরলোক কোন দূগর্তি হয় না। হে বৎস,তার কারণ,কল্যাণকারীর কখনো অধোগতি হয় না।
প্রাপ্য পুন্যকৃতাং লোকানুষিত্বা শাশ্বতীঃ সমাঃ।
শুচীনাং শ্রীমতাং গেহে যোগভ্রষ্টোহভিজায়তে।।৬/৪১
অথবা যোগিনামেব কুলে ভবতি ধীমতাম।
এতদ্ধি দুর্লভতরং লোকে জন্ম যদীদৃশম।।৬/৪২
তত্র তং বুদ্ধিসংযোগং লভতে পৌর্বদোহিকম্ ।
যততে চ ততো ভূয়ঃ সংসিদ্ধৌ কুরুনন্দন।।৬/৪৩
পূর্বাভ্যাসেন তেনৈব হ্রিয়তে হ্যবশোহপি সঃ।
জিজ্ঞাসুরপি যোগস্য শব্দব্রহ্মাতি বর্ততে।।৬/৪৪
অর্থঃ সেই যোগভ্রষ্ট ব্যক্তি পূণ্যকারিগণের লোক সকল প্রাপ্ত হয় এবং তথায় বহু বৎসর সুখে বাস করে পরে শুদ্ধাচারী ধনী-বণিক দিগের গৃহে জন্মগ্রহণ করেন।৪১
অথবা তিনি জ্ঞানী,যোগীগণেরই বংশে জন্মগ্রহণ করেন; ঈদৃশ জন্ম জগতে নিশ্চয়ই দুর্লভতর।।৪২
তিনি সেই দুই প্রকার জন্মেই পূর্বদেহে জাত সেই ব্রহ্ম বিষয়ক বুদ্ধি সংযোগ লাভ করে থাকেন এবং মোক্ষ লাভ বিষয়ে অধিকতর প্রযত্ন করে থাকেন।৪৩
সেই পূর্ব দেহ জাত অভ্যাস বসে তিনি যেন অবশ হয়েও যোগ সাধনের প্রতি আকৃষ্ট হন। এই প্রকার যোগশাস্ত্র জিজ্ঞাসু পুরুষ,যোগ অনুশীলন করার সময়ই বেদোক্ত সকাম কর্মমার্গকে অতিক্রম করেন অর্থাৎ বেদোক্ত কর্ম্মফল সকল অপেক্ষাও অধিক ফল লাভ করে মুক্ত হয়ে থাকেন।৪৪
শ্রীমদ্ভগবদগীতার উপরোক্ত বক্তব্য মাতা নন্দঠাকুরানীর জীবনে তাঁর সাধনমার্গে সন্দেহাতীত ভাবে প্রয়োগ হয়েছে। বাবাজী শ্রীমৎ নিখিল গোবিন্দ দত্ত মহাশয় বলেছেন,“নন্দমা শুধুমাত্র তাঁর প্রারদ্ধ ভোগ করার জন্য পূনঃ পূনঃ জন্ম গ্রহন করেছেন। কিন্তু তিনি যতবার জন্মগ্রহন করেছেন ততবারই পদ্মিনী শ্রেণীর কামশূন্যা নারীরূপে জন্মগ্রহণ করেছেন। তাঁর সমগুণ সম্পন্ন কোন পুরূষ তাঁর স্বামীরূপে না থাকায় নন্দমা’র ব্রহ্মতেজ বশতঃ তাঁর জন্মজন্মান্তরের স্বামী অকাল মৃত্যুবরণ করতেন। পরিশেষে,সেই আনন্দমঠের জীবনী সঙ্গী স্বামী জীবানন্দ মহারাজ্জীর সঙ্গে নন্দমাতার দেখা হয় বাংলা ১৩২৮ সালে এবং তখনই পূর্ব দেহজাত যোগ সাধন প্রণালী যেন হারানো মানিকের ন্যায় পূনরায় প্রাপ্ত হন। স্বামী জীবানন্দ পরমহংস অপার করুনাবলে তিনি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সাধনায় সিদ্ধিলাভ করেন। বাংলা ১৩২৮ সাল থেকেই নন্দমা স্বামী জীবানন্দ পরমহংস প্রচারকালীন সময়ে সার্বক্ষনিক সঙ্গী ছিলেন। নন্দমা স্বামী জীবানন্দ পরমহংস এর সঙ্গে ছিলেন বলেই স্বামীজী(জীবানন্দ)গৃহিদের মধ্যে খুব সহজেই যোগ কর্ম্ম প্রচার করতে পেরেছিলেন।
পরম করুনাময়ের নিকট আমাদের প্রার্থনা নন্দমাতা ঠাকুরানীর মত সাধ্বী নারী যেন যুগে যুগে আমাদের মাঝে তিনি প্রেরণ করেন। যাঁদের আর্দশে অনুপ্রানীত হয়ে যেন আমরা মর্ত্যলোকে জীবগণ মুক্তির আশায় মেতে উঠতে পারি। ওঁ তৎ সৎ। ওঁ শান্তি!শান্তি!!শান্তি!!!
প্রচারেঃ মানব ধর্ম্ম প্রচারক সংঘ,কেন্দ্রীয় জীবানন্দ মঠ,কুঠিবাড়ী,ধুনট,বগুড়া।